যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

পুত্রবধূ কেনা সম্পদ নয়

তসলিম শিমুল

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর,২০২৬, ১১:০০ এ এম
পুত্রবধূ কেনা সম্পদ নয়

সন্তানের বিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই বিয়েকে কেন্দ্র করে প্রতিটি বাবা-মায়েরই কিছু স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও আবেগ থাকে। বিশেষ করে মেয়েকে বিদায় দেওয়ার সময় বাবা-মায়ের মনে কাজ করে একধরনের উদ্বেগ—নতুন পরিবারে মেয়েটি কেমন থাকবে, সবাই তাকে আপন করে নেবে কি না, তার সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়াবে কি না। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে এই আবেগ ও ভালোবাসার জায়গাটি দখল করে নেয় উপহার, আপ্যায়ন ও আর্থিক লেনদেনের এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা।

মেয়ের বিয়েতে সামর্থ্য অনুযায়ী উপহার দেওয়া, আত্মীয়স্বজনকে আপ্যায়ন করা কিংবা নতুন জামাতাকে ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে কিছু দেওয়া অন্যায় নয়। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ভালোবাসার এই প্রকাশকে নিয়মে পরিণত করা হয়, আর নিয়মিত উপহার দেওয়াকে একসময় দায়িত্ব কিংবা অধিকার বলে ধরে নেওয়া হয়।

মেয়েকে বিয়ে দেবেন, কিন্তু তার শ্বশুরবাড়ির মানুষের প্রত্যাশাকে এমনভাবে অভ্যাসে পরিণত করবেন না, যার বোঝা একসময় আপনার মেয়েকেই বহন করতে হয়।

বিয়ের সময় হয়তো সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও অনেক কিছু দিলেন। বিয়ের পরও বিভিন্ন উপলক্ষে মিষ্টি, পিঠা, ফলমূল, রান্না করা খাবার কিংবা অন্যান্য উপহার পাঠাতে থাকলেন। শুরুতে হয়তো সবকিছুই আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করা হবে। কিন্তু নিয়মিত পাওয়ার ফলে একসময় সেটিই স্বাভাবিক প্রত্যাশায় পরিণত হতে পারে। কোনো একদিন ব্যস্ততা, অসুস্থতা কিংবা আর্থিক অসুবিধার কারণে কিছু পাঠাতে পারলেন না। তখনই হয়তো কারও মুখে অসন্তোষ প্রকাশ পাবে, কেউ খোঁচা দিয়ে কথা বলবে, আবার কেউ আপনার মেয়ের সামনেই এমন মন্তব্য করবে, যা তার মনে গভীর কষ্ট তৈরি করতে পারে।

এখানে একটি বিষয় বুঝতে হবে—আপনি হয়তো ভালোবেসে উপহার পাঠিয়েছেন, কিন্তু গ্রহীতা যদি সেটিকে ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে না দেখে নিয়মিত পাওয়ার অধিকার মনে করেন, তাহলে সম্পর্কের সৌন্দর্য ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে।

আমাদের সমাজে বিয়ের পর অধিকাংশ মেয়েকেই স্বামীর পরিবারের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করতে হয়। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, নতুন সম্পর্ক—সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও অনেকাংশে মেয়েটির ওপর এসে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে শ্বশুরবাড়ির মানুষের অযৌক্তিক প্রত্যাশা কিংবা উপহারকেন্দ্রিক অসন্তোষের শিকার হলে তার মানসিক চাপ আরও বেড়ে যায়। অথচ যে মেয়েটিকে বাবা-মা এত যত্নে বড় করেছেন, তার নতুন জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপত্তা, মর্যাদা, ভালোবাসা ও মানসিক প্রশান্তি।

তাই মেয়ের বিয়ের আগে শুধু পাত্রের শিক্ষা, পেশা, আর্থিক অবস্থা কিংবা সামাজিক পরিচিতি দেখলেই চলবে না। দেখতে হবে তার পারিবারিক মানসিকতা, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, দায়িত্ববোধ এবং অর্থ ও উপহারের বিষয়ে পরিবারের প্রত্যাশা কেমন। বিয়ের আগে খোঁজখবর নেওয়া সন্দেহপ্রবণতা নয়; বরং সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় দায়িত্বশীলতার পরিচয়।

যে পরিবার পুত্রবধূর পরিবারকে সম্মান করতে জানে না, যে পরিবার উপহারকে ভালোবাসার মাপকাঠি বানায়, কিংবা যে পরিবার বিয়েকে দুই পরিবারের আত্মীয়তার পরিবর্তে সুযোগ হিসেবে দেখে, তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা করার আগে অবশ্যই ভাবতে হবে। কারণ বিয়ের আয়োজন কয়েক দিনের, কিন্তু এই সম্পর্কের প্রভাব বহন করতে হয় দীর্ঘ জীবন।

একই শিক্ষা ছেলের বাবা-মায়ের জন্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ছেলের বিয়ে মানে নতুন একজন মানুষকে নিজের পরিবারে স্বাগত জানানো। সে অন্য একটি পরিবারে বেড়ে উঠেছে, তারও নিজস্ব অনুভূতি, অভ্যাস, স্বপ্ন ও আত্মসম্মান রয়েছে। তাকে পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করার অর্থ এই নয় যে, তার পরিবারকে নিয়মিত উপহার দিয়ে নিজেদের সন্তুষ্ট রাখতে হবে।

ছেলের বিয়েতে উপহার পাওয়া কোনো পরিবারের মর্যাদার মাপকাঠি হতে পারে না। কে কত সোনা দিলো, কত আসবাব দিলো, কত টাকা খরচ করলো কিংবা বিয়ের পর কতবার কী পাঠালো—এসব হিসাব দিয়ে আত্মীয়তার গভীরতা পরিমাপ করা যায় না। বরং যে পরিবার নিজের সন্তানের বিয়েকে কেন্দ্র করে অন্য পরিবারের সামর্থ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তারা সম্পর্কের শুরুতেই পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গাটিকে দুর্বল করে দেয়।

ছেলের বাবা-মাকে মনে রাখতে হবে, পুত্রবধূ কারও কেনা সম্পদ নয়; সে একজন স্বতন্ত্র মানুষ, একটি পরিবারের আদরের সন্তান। তাকে ভালোবাসা, সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়া শ্বশুরবাড়ির নৈতিক দায়িত্ব। তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী উপহার দেওয়া বা না দেওয়ার সঙ্গে তার প্রতি আচরণের কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত নয়।

আজ যে মেয়েটি আপনার ঘরে পুত্রবধূ হয়ে এসেছে, কাল সে-ই আপনার অসুস্থতায় পাশে দাঁড়াতে পারে, আপনার প্রয়োজন বুঝতে পারে, আপনার সুখ-দুঃখের সঙ্গী হতে পারে। তবে এই আন্তরিকতা কোনো লেনদেনের বিনিময়ে অর্জন করা যায় না। সম্মান দিলে সম্মান পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, ভালোবাসা দিলে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আর অবহেলা, অপমান কিংবা অযৌক্তিক প্রত্যাশা দিয়ে কাউকে আপন করে নেওয়া যায় না।

এখানে বাবা-মায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে—সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক মর্যাদার শিক্ষা দেওয়া। ছেলেকে শেখাতে হবে, স্ত্রীকে সম্মান করা তার দায়িত্ব; স্ত্রীর পরিবারের কাছ থেকে কোনো সুবিধা আদায় করা তার অধিকার নয়। মেয়েকেও শেখাতে হবে, সম্পর্ক রক্ষার নামে অন্যায় প্রত্যাশার কাছে নীরবে আত্মসমর্পণ করাই সংসার টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় নয়। সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও স্পষ্ট সীমারেখা।

তবে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, সব পরিবার এক রকম নয়। অনেক পরিবার উপহার দেয় নিখাদ ভালোবাসা থেকে, আবার অনেক পরিবার সামর্থ্যের সীমা অতিক্রম করেও সম্পর্কের খাতিরে কিছু করতে চায়। তাই উপহার দেওয়া বা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে কাউকে বিচার না করে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত—কোনো উপহার যেন কারও ওপর বাধ্যবাধকতা তৈরি না করে, কোনো প্রত্যাশা যেন অন্যের আত্মসম্মানে আঘাত না করে এবং কোনো সম্পর্ক যেন আর্থিক সামর্থ্যের কাছে জিম্মি হয়ে না পড়ে।

বিয়ের আয়োজনের জৌলুশ কয়েক দিনেই ম্লান হয়ে যায়। দামি পোশাক, সোনার গয়না, আসবাব কিংবা বাহারি খাবারের স্মৃতি সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে আসে। কিন্তু বিয়ের পর কে কাকে সম্মান করেছে, কে বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে, কে অন্যের সীমাবদ্ধতাকে বুঝেছে—সেই বিষয়গুলোই সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি তৈরি করে।

সুতরাং মেয়ের বিয়েতে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ভালোবাসা প্রকাশ করুন, কিন্তু কাউকে অযৌক্তিক প্রত্যাশা করার সুযোগ তৈরি করবেন না। ছেলের বিয়েতে কোনো উপহার পাওয়ার হিসাব না করে নতুন মানুষটিকে আপন করে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলুন। আত্মীয়তা হোক পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে, প্রতিযোগিতা কিংবা লেনদেনের ভিত্তিতে নয়।

কারণ বিয়ে শুধু দুটি মানুষের একসঙ্গে পথচলার নাম নয়; এটি দুটি পরিবারের মধ্যে বিশ্বাস, দায়িত্ব ও মানবিকতার সেতুবন্ধন। সেই সেতু উপহারের ভারে নয়, ভালোবাসা ও মর্যাদার ভিত্তিতেই দীর্ঘস্থায়ী হয়।

সবকিছু সুন্দরভাবে পাওয়া যায় না; অনেক কিছু যত্ন, ধৈর্য ও দায়িত্ববোধ দিয়ে সুন্দর করে নিতে হয়। সংসারও তার ব্যতিক্রম নয়। যে পরিবার লোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, অন্যের সামর্থ্যকে সম্মান করতে জানে এবং নতুন সদস্যকে আপন করে নেওয়ার মানসিকতা রাখে, সেই পরিবারেই সুস্থ ও সুন্দর সম্পর্কের সম্ভাবনা বেশি।

লেখক: পেশাজীবী

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)