যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

স্মরণ

ছাকিনের জন্য ভালোবাসা

রায়হান সিদ্দিক

প্রকাশ : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর,২০২৬, ১২:০১ এ এম
ছাকিনের জন্য ভালোবাসা

২৫ বছরের তরুণ, কেবল স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। যখনই কথা হতো, জীবনের নানা টানাপড়েনের কথা বলতো। সহকর্মী হিসেবে কখনো জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে পরামর্শ দিয়েছি, কখনো এড়িয়ে গেছি। কিন্তু কখনো বুঝতে পারিনি, এত অল্প বয়সে বুকের ভেতর এক অচেনা পাথর বেঁধে রেখেছিল ছাকিন হোসেন।

ছাকিনের গল্পটা ভিন্ন হতে পারতো, কিন্তু সমাজের এক অচেনা দানব যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল। তাই সংবাদের পেছনে ছুটে চলা টগবগে তরুণ নিজেই জায়গা করে নিলো খবরের পাতায়।

চলতি বছরের ১৬ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক রহস্যময় বার্তা দিয়েছিল ছাকিন। লিখেছিল, ‘বিদায় পৃথিবী’। লিখেছিল, ‘রাত ৯টায় বেঁধে রেখো’। আমরা ছাকিনকে বেঁধে রাখতে পারিনি। সে হারিয়ে গেছে, আর আমাদের জন্য রেখে গেছে একাধিক অসমাধানযোগ্য প্রশ্ন।

সেদিন বিকেলে যখন প্রথম জানতে পারি ছাকিন আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে, প্রধান সম্পাদক আহসান কবীরের পরামর্শে সাথে সাথে ওর বাড়িতে ছুটে যাই। তখন সহকর্মী হিসেবে এটিকে কেবলই দায়িত্ব মনে হয়েছিল। তবে দায়িত্বের সেই বোঝা আমি নিতে পারিনি। আজও ছাকিনের বলা শেষ কথা আমার কানে বাজে, ‘ভাইয়া, আমাকে গোসল করায়েন না; তাহলে এইটা আমার শেষ গোসল হবে।’ ছাকিন তার কথা রেখেছে; সেটাই ছিল জীবিত এই সহকর্মীর শেষ গোসল।

সেদিন মাগরিবের আজানের কিছু সময় আগে ছাকিনের বাড়ি থেকে সুবর্ণভূমি দপ্তরে এসে পৌঁছাই আমি আর আমার আরেক সহকর্মী। ছাকিনের বাড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো প্রধান সম্পাদক আহসান কবীর বাবু ভাইকে বলে সবে নিজের কাজে মন দিয়েছি। রাত ৮টার কিছু সময় আগে আবার খবর আসে ছাকিন ফের আত্মহননের চেষ্টা করেছে। খবরটি শুনে মোটেও বিচলিত হইনি, কারণ ওর বাড়ি থেকে ফেরার আগে আরেকটি কথা দিয়েছিল ছাকিন। বলেছিল, ‘ভাইয়া, অফিসে চলে যান, কোনো সমস্যা নেই। আমি স্বাভাবিক আছি। চিন্তা করবেন না, আমি আর এমন কিছু করবো না।’ যদিও শেষ কথাটি আর রাখেনি বোকা ছেলেটি।

ছাকিনের সাথে আমার পরিচয় খুব অল্প সময়ের। সুবর্ণভূমিতে যোগ দেওয়ার পর অল্প কিছুদিন সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি। ওর চোখ দুটো সবসময় জ্বলজ্বল করতো। কখনো অজুহাতের বিনিময়ে দায়িত্বের ভার সরিয়ে দেয়নি। একদিন হঠাৎ করে অফিসে এসে আমাকে বললো, ‘ভাইয়া, এতো স্পেশাল স্টোরি আমার পক্ষে আর দেওয়া সম্ভব না। লাইভ, ডে ইভেন্ট... আমি আর পারছি না ভাইয়া।’ সেদিনও আমি ওকে বুঝিয়েছিলাম, ‘এখনই পরিশ্রমের সময়, শেখার সময়। এখন কষ্ট করো, আগামীতে ভালো ফল পাবে।’ তারপর আর কথা বাড়ায়নি ছাকিন। আমিও চেষ্টা করেছি, যতটা সম্ভব সহজ করার।

ছাকিনের প্রিয় সুবর্ণভূমি এক বছর পার করে এখন দ্বিতীয় বর্ষে। আজ বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠান হচ্ছে। ছাকিন আমাদের মাঝে থাকলে হয়তো আজও ওকে কঠিন কঠিন কাজই আমি দিতাম। কারণ ছাকিনকে বিশ্বাস করা যেত, কাজ যত কঠিনই হোক না কেন, ছেলেটি ঠিকই তুলে আনবে। চলতি বছরের ১১ এপ্রিল নিষ্ঠার সাথে তার প্রমাণ দিয়েছিল ছাকিন। দিনটি ছিল শনিবার, সুবর্ণভূমির নতুন কার্যালয় উদ্বোধনের দিন। কদিন ধরে ছাকিন অসুস্থ; অ্যানাল ফিশারের যন্ত্রণা, তার ওপর জ্বর। তখনও অজুহাত দেয়নি, কাজ করেছে, কঠিন কাজগুলোই করেছে। আজ মো. ছাকিন হোসেনকে অনেক বেশি মনে পড়ছে। আজও হয়তো সবথেকে কঠিন কাজগুলো ওকেই দিতাম।

ছাকিন হয়তো কোনোদিনই জানবে না, অফিসের সবাই তাকে বোঝার চেষ্টা করেছে। সে হয়তো কোনোদিনই জানবে না, আমরা তার পারিবারিক সংকট নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। ছাকিন হয়তো কোনোদিনই জানবে না, সহকর্মী ছাড়াও সে আমাদের ভাই ছিল। আদরের ছাকিন, ছোট্ট সাকিন।

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, সুবর্ণভূমি

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)