যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

যুদ্ধের মাশুল: ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিপর্যয়ের বার্তা

প্রকাশ : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
যুদ্ধের মাশুল: ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিপর্যয়ের বার্তা

বিশ্ব রাজনীতিতে যুদ্ধের পরিণতি যে শুধু রণক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তার অভিঘাত ক্ষমতার মসনদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন তারই একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক সতর্কবার্তা।

অন্যদিকে, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুটি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—যুদ্ধের নামে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত শাসকদের জন্য বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পেছনে অর্থনৈতিক অসন্তোষ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, রাজনৈতিক বিভাজন এবং প্রশাসনের প্রতি জনঅনাস্থাসহ নানা কারণ রয়েছে। তবে এসব কারণের মধ্যে ইরান যুদ্ধ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। এর পেছনে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও সামরিক শক্তি দুর্বল করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মতো লক্ষ্য কাজ করেছে। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি।

ইরানও যে সহজে নতি স্বীকার করবে না, তা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি প্রমাণ করেছে। পাল্টা বিধ্বংসী হামলা, উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকট যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য নতুন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দীর্ঘ সংঘাতের ফলে মার্কিন সামরিক ব্যয় বিপুলভাবে বেড়েছে। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ আগস্ট পর্যন্ত ইরান-সংশ্লিষ্ট সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। অথচ যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জন করতে পারেননি ট্রাম্প-নেতানিয়াহু জুটি। বরং আকস্মিক বোমা হামলা করে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার মতো কাপুরুষোচিত কাজ করে বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হন।

ইরান যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তেলের বাজারে অস্থিরতা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। মার্কিন ভোটারদের কাছে পররাষ্ট্রনীতির বড় বড় সাফল্যের চেয়ে বাজারে পণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয়, কর্মসংস্থান ও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প প্রশাসন এই সাধারণ মানুষের অসন্তোষ যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে যুদ্ধের রাজনৈতিক মাশুল দিতে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলকে।

ইসরায়েলের নির্বাচনও একই ধরনের রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। নেতানিয়াহুর জোট ১২০ আসনের পার্লামেন্টে পেয়েছে ৫৩টি আসন, যেখানে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি। বিরোধী পক্ষ পেয়েছে ৪৮টি এবং আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন। অর্থাৎ নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন জোট গঠনের সমীকরণের ওপর নির্ভরশীল। গাজায় নির্বিচার গণহত্যা, ইরান আগ্রাসন তার জনপ্রিয়তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধের মাধ্যমে নিরাপত্তা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যে রাজনৈতিক দর্শন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু অনুসরণ করেছেন, ভোটাররা তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে সাময়িকভাবে চাপে রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা যায় না। বরং যুদ্ধ মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বিপর্যস্ত করে।

বিশ্বের জন্য এই নির্বাচনি বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অস্ত্রভান্ডার কিংবা সামরিক ঘাঁটির সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় তার কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জনগণের আস্থার ওপর। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর জন্য সময় এসেছে সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করার। যুদ্ধ নয়, শান্তি ও কূটনীতিই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান অবলম্বন। কারণ যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু তার মাশুল বহন করতে হয় প্রজন্মের পর প্রজন্মকে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)