মো. মিজানুর রহমান
অজগর শব্দটিতে কোনো কার-ফলা নেই। অজগরের বিষও নেই। তবু এটি সাপ, মস্ত সাপ। সাপের বানান সোজা, আবার বিষও নেই। নিরীহ এই সাপ নাকি তার শিকারকে নিঃশ্বাসের শক্তিতে কাছে টেনে আনে। ‘নিঃশ্বাসে তুমি, বিশ্বাসে তুমি’ এমন শক্ত ভালোবাসায় শিকারকে জড়িয়ে (পেঁচিয়ে) ধরে। শিকার কষ্টে যখন জোরে নিশ্বাস নিতে চেষ্টা করে তখন অজগর আরও জোরে জড়িয়ে (পেঁচিয়ে) ধরে ভালোবাসায় শিকারকে নিঃশেষ করে ফেলে। অর্থাৎ অজগর তার শিকারকে নিশ্বাসে টানতে পারে না বরং ওর কবজায় পড়ে কেউ নিশ্বাস নিতেই পারে না।
পুরুষেরা কেঁচো দিয়ে মাছ ধরার টোপ বানিয়ে থাকলেও নারীকুল কেঁচোকে ভয় পায়। কারণ কিছু কেঁচো সাপের ছানার মতো খানিকটা লম্বাটে হয়। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, কোথায় অজগর সাপ আর কোথায় কেঁচো? আসলে নারীকুল কেঁচো দেখেই যতটা ভয় পায় বা আঁতকে ওঠে, পুরুষেরা অতোটা আঁতকে উঠতে অজগর পর্যন্ত অপেক্ষা করে। কাজেই ভয়ের মাত্রা হিসেবে কেঁচোকে আনলাম। তবে নারীকুল প্রকৃতপক্ষে ভয় নয়, ঘৃণাতেই আঁতকে ওঠে। তেলাপোকাতেও হয়তো তাই হবে। নারীকুল অজগর নিয়ে ভাবে না। যে নারীরা বীরপুরুষ শাসিয়ে সংসার সাম্রাজ্য পরিচালনায় অভ্যস্ত তাদের আবার ভয় কীসে!
যাই হোক সাপ এবং কেঁচোর পেট কোনটা, আমরা সাধারণেরা দেখলে বুঝতে পারবো না। কেঁচোর মুখ কোনটা সেটাও বুঝতে আমাদের খেই হারিয়ে ফেলতে হয়। তবে কেঁচোর সুবিধা হলো এর পরিপাকতন্ত্র একটি সোজা ও সরল নলের মতো, যা এর শরীরের সামনের মুখ থেকে শুরু করে একেবারে শেষ প্রান্তের মলদ্বার পর্যন্ত বিস্তৃত। এরা মুখ দিয়ে খাদ্য গ্রহণের পর পরিপাক হতে হতে সোজা মলদ্বার দিয়ে ভার্মি কম্পোস্ট (সার) হয়ে বেরিয়ে যায়। অর্থাৎ খাদ্য কোথাও অবস্থান করে না। অজগরের ক্ষেত্রে সেটা হয় না। ওদের পেটে খাদ্য অবস্থান নেয়, হজম হতে সময় নেয়। খাবার প্রবেশের সাথে সাথে পাকস্থলীর প্রাচীর থেকে প্রচুর পরিমাণে শক্তিশালী হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড এবং পাচক রস নিঃসৃত হয়, যা শিকারের চামড়া ও মাংস গলিয়ে ফেলে। হজম না হওয়া পশম, পালক বা নখ মল হিসেবে বের হয়ে যায়। অর্থাৎ অজগর অনেক বড় বড় প্রাণীও অনায়াসে গিলে ফেলে এবং সময় নিয়ে হজম করতে চেষ্টা করে। বিপত্তিটাও বাঁধে ঠিক এখানেই। যখন পেটের তুলনায় বড় প্রাণী গিলে ফেলে তখন এরা খানিকটা বেকায়দায় পড়ে যায়। ভরা পেটে চলাচল কতটা কষ্ট, তা যাদের মেদভুঁড়ি আছে তারা জানে। অতো বড় পেট নিয়ে ওরা দ্রুত যেতে পারে না। স্থির হয়ে হজম করতে চেষ্টা করে। তাই আহাররত অবস্তায় প্রায়ই অজগরকে দেখতে পাওয়া যায়। যদি সে বন্যপ্রাণী খেয়ে এলিয়ে থাকে তো রক্ষা, যদি কারো শখের প্রাণী খেয়ে ফেলে তাহলে ওর পেট চিরে প্রাণীর মালিক তা বের করে আনতে পারে। অর্থাৎ পেটের তুলনায় খাবার বড় হলে অজগর আচমকা বিপদের সম্মুখীন হতে পারে।
অজগর নির্বিষ। একে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওরা ফনা তোলে না। বীণ বা বাঁশির সুরে ছুটে আসে না। হাসনাহেনা অথবা শুধু হেনা—কোনোটার ঘ্রাণই ওদের টানে না। অবুঝ শিশুদের ‘অ-তে অজগর ঐ আসছে তেড়ে’ বলে যতটা ভয় দেখানো হয়, অকারণে অতোটা তেড়েও ওরা আসে না। তবে হ্যাঁ, অজগর সাপ, ওর বিষ থাক আর না থাক। ওর নামের বানানে কার বা ফলা কিছু থাক বা না থাক ও অ-তেই অজগর। অর্থাৎ শুরুতেই সাপ।
এবার আসি মূল আলোচনায়। আমরা অধিকাংশ মানুষ নিজেকে কেঁচোর পৌষ্টিকতন্ত্রের মতো সরল হিসেবে দাবি করি। ভেতরে কোনো প্যাঁচ নেই। অথচ কেঁচো ও অজগরের মধ্যে মানুষ নিজেকে কেঁচো নয়, অজগর ভাবতেই পছন্দ করে এবং আচরণেও সেই দাপট দেখা যায়। এদের নিজ পেটের সাইজ, শরীরের শক্তি না বুঝে খাবার দেখা মাত্র খপ করে ধরে মুখে পুরে দেওয়ার অভ্যাস আছে অথবা সুযোগ পেলেই শরীর অপেক্ষা মনের জোরে চারটে বড় কথা বলে ফেলার অভ্যাস আছে। এরা দাপটের চোটে না চেটে তালের আঁটি পর্যন্ত গিলে ফেলতে চেষ্টা করে। তারপর বোতল বোতল অ্যাভোল্যাক খেয়ে অথবা গ্লিস আপ গুঁজে উদ্ধার হতে চেষ্টা করে। তারা বুঝতে চায় না যে, মুখের সাইজের সাথে যা যায়, তা পশ্চাদ্দেশ দিয়ে বের হয়ে যাবে—এমনটা নয়। নিজের শরীর ও হজম প্রক্রিয়া সম্পর্কে জেনে তবে কথা মুখে তুলতে হয়, খাবার মুখে তুলতে হয়। যে কথা বলে বিপদে পড়তে হয়, বিপত্তির সৃষ্টি হয়, যে কথার প্রভাব প্রতিরোধ করার শক্তি নেই, তা এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়। যে খাদ্য হজম প্রক্রিয়া নষ্ট করে দিতে পারে বা বদ হজম সৃষ্টি করতে পারে তা সুস্বাদু হলেও এড়িয়ে যাাওয়া উচিত। তাতে হয়তো নিজেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে মনে হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে তা নিজের জন্যই নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করে।
মূল কথা মাানুষকে ভয়ংকর হয়ে উঠতে হবে কেন? জীবনের শুরুটা কেন ভয় দিয়ে শুরু হতে হবে? অ-তে অজগরই কেন হতে হবে? বরং ‘অ-তে অজগরটি আসছে তেড়ে’ না হয়ে ‘অ-তে অলি ওড়ে ফুলে ফুলে’ শিক্ষাটি মধুময়। শৈশবের শুরুটা মধুময় হওয়া জরুরি। মানুষের সমগ্র জীবন মধুময় রাখা প্রয়োজন। আসুন, আমরা অ-তে অজগর না হয়ে অলি হই। বিশ্বজুড়ে মধু ছড়াই।
লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক