ভূতত্ত্ববিদ্যা
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘শুনব আমি ইঙ্গিত কোন মঙ্গল হতে আসছে উড়ে’। কবির আশাবাদ হয়তো বিফলে যায়নি। কারণ গবেষকদের তরফে জানা যাচ্ছে, লোহিত গ্রহ মঙ্গলের গভীর অতলে এমন একটি ‘মহাসাগর’ রয়েছে, যার তুলনায় পৃথিবীর মহাসাগরগুলো ‘উপসাগর’ ছাড়া আর কিছুই নয়। আবার হালে শোনা যাচ্ছে, আফ্রিকা মহাদেশ বিভক্ত হয়ে নতুন একটি মহাসাগর সৃষ্টি হচ্ছে। অবশ্য এই মহাসাগর তৈরি হতে কয়েক লাখ বছর লেগে যাবে। সম্প্রতি গবেষকরা জানালেন, এক পিলে চমকানো খবর। তারা বলছেন, পৃথিবীতে মহাসাগর মোট ছয়টি এবং ষষ্ঠ মহাসাগরটি ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরেই রয়েছে, যা প্রশান্ত মহাসাগরের চেয়েও অনেক বড়। মাটির মাত্র ৭০০ কিলোমিটার গভীরে এটির অবস্থান।
জার্মানি, ইতালি এবং আমেরিকার কয়েক বিজ্ঞানী মিলে সন্ধান পেয়েছেন এই মহাসাগরের। তাদের দাবি, এই পৃথিবীতেই রয়েছে ছয় নম্বর একটি মহাসাগর। সেটি মানুষের নজরেই আসেনি। বলা যেতে পারে, এ যেন ১৮৬৯ সালে জুলে ভার্নের লেখা ‘জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ’ কল্পকাহিনির বাস্তব হয়ে ওঠা।
ফ্রাঙ্ক ব্রেঙ্কারের নেতৃত্বাধীন গবেষক দলের দাবি, পৃথিবীর আপার ও লোয়ার ম্যান্টলের মধ্যবর্তী অংশের ‘ট্রানজিশন জোনে’ (পরিবর্তনশীল অঞ্চল) লুকিয়ে রয়েছে প্রকাণ্ড এক জলের আধার। এই জলভাণ্ডারের আয়তন নাকি ভূপৃষ্ঠে অবস্থিত আমাদের পরিচিত পাঁচ মহাসাগরের সম্মিলিত আয়তনের প্রায় তিনগুণ।
এতদিন পর্যন্ত ধারণা করা হতো, উচ্চতাপের কারণে এই অঞ্চলে পানি থাকা সম্ভব নয়। তবে সদ্য-আবিষ্কৃত দুটো স্ফটিকের আণবিক গঠন প্রমাণ করে দেয়, পানি রয়েছে পৃথিবীর ট্রানজিশন জোনেও। যদিও তরল অবস্থায় সেই পানি নেই। নেই বরফ বা জলীয় বাষ্পের আকারেও। বরং, তা উচ্চ চাপ এবং তাপে ভূগর্ভস্থ খনিজের সঙ্গে রাসায়নিক বন্ধন তৈরি করে পরিণত হয়েছে স্ফটিকে।
আফ্রিকার বতসোয়ানা থেকে পাওয়া একটি হীরা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এই আশ্চর্য জলভাণ্ডারের হদিশ মিলেছে। হীরাটি তৈরি হয়েছিল ভূগর্ভের প্রায় ৪০০ মাইল গভীরে। এই হীরার গায়ের কিছু চিহ্ন থেকেই গবেষকেরা প্রথম এক বিরাট জলভাণ্ডারের অস্তিত্ব অনুমান করে তার খোঁজ শুরু করেন। ভূপৃষ্ঠ ও ভূকেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে অজস্র স্তর। এইসব স্তরের মাঝে কোথাও পানি সঞ্চিত আছে কিনা, এ তর্ক বহুকালের। গ্যেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণা এই তর্কে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। ১ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যরে এই হীরা সম্পর্কে গবেষকদের মত, মারাত্মক চাপের কারণে এই হীরার সৃষ্টি। এবং এই হীরার মধ্যে বেশির ভাগটাই পানি। আর সেখান থেকে সন্ধান চালাতে চালাতে এই মহাসাগরের অস্তিত্বের আন্দাজ পেয়েছেন গবেষকরা।
এই হীরার রাসায়নিক বিশ্লেষণ রীতিমতো চমকে দেয় বিজ্ঞানীদের। তার কারণ, শুধু কার্বন নয়, বরং এই হীরার স্ফটিকের মধ্যে রয়েছে পানির অণুও। শুধু বতসোয়ানার এই হীরাই নয়, প্রায় একই গভীরতা থেকে সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে ‘পেরিডট’ এবং ‘রিংউডাইট’ নামে দুটি খনিজ। অবশ্য খনিজের তুলনায় তাদের স্ফটিক বলাই বেশি যৌক্তিক। কারণ, কারণ পানির অণুর সঙ্গে খনিজ অণুর বন্ধনের ফলেই জš§ হয়েছে এই স্বচ্ছ ক্রিস্টাল বা স্ফটিকগুলোর। আশ্চর্যের বিষয় হলো ভূপৃষ্ঠে নিয়ে আসার পর দীর্ঘক্ষণ তাদের খোলা পরিবেশে রেখে দিলে ভেঙে যায় এই স্ফটিক। আলাদা হয়ে যায় পানি ও মূল খনিজ। সেইসঙ্গে তৈরি হয় প্রচুর কার্বন-ডাই-অক্সাইড।
গবেষকদের দাবি, পেরিডট নামে একটি বিশেষ খনিজের উপস্থিতির জন্যই এই জলভাণ্ডার সঞ্চিত হয়েছে। উচ্চ পানিধারণ ক্ষমতা রয়েছে এই খনিজের। এই জলাধারটি আমাদের পরিচিত ঐতিহ্যবাহী মহাসাগর নয়, বরং পানির অণুগুলো রিংউডাইটের স্ফটিক কাঠামোর মধ্যে আটকে রয়েছে। গবেষকদের দাবি, এই স্তরে পাথরের মাঝে আটকে আছে পানি।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটিকে মহাসাগর হিসেবে ভাবার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে দুই হাজারটি সিসমোগ্রাফের একটি সিস্টেম ব্যবহার করে গবেষকরা ৫০০টিরও বেশি ভূমিকম্পের কম্পন বিশ্লেষণ করে দেখতে পেয়েছেন, তরঙ্গের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তরঙ্গের গতিতে ধীরতা ছিল। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, পাথরের জন্য জলাধারটি স্পঞ্জ হিসেবে কাজ করছে। পানির পুলটি রিংউডাইট নামে পরিচিত একটি নীল শিলা গঠনের মধ্যে আটকা পড়েছিল। আবিষ্কারটি এটাই প্রমাণ করে, মহাসাগরগুলো ধূমকেতুর প্রভাবের পরিবর্তে পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। এটি লাখ লাখ বছর ধরে আমাদের পৃষ্ঠের মহাসাগরগুলোর সামঞ্জস্যপূর্ণ আকারকে আরো সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে। এই জলাধারটি একটি ঐতিহ্যবাহী সমুদ্র নয় বরং রিংউডাইটের স্ফটিক কাঠামোর মধ্যে আটকে থাকা জলের অণু। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এই পানিপৃষ্ঠ সমুদ্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই পানি যদি ভূপৃষ্ঠে থাকতো, তাহলে পৃথিবীতে শুধু পাহাড়ই দৃশ্যমান থাকতো। এই আবিষ্কারটি ইঙ্গিত দেয় যে, পৃথিবীর পানিচক্র প্রচলিত বিশ্বাসের চেয়ে জটিল। তবে এই আবিষ্কারই নতুন দিগন্ত খুলে দেয় গবেষকদের সামনে। গবেষকদের তৈরি এই মডেল অনুযায়ী, পৃথিবীতে পানি ছিল এই মহাজাগতিক সংঘর্ষের বহু আগে থেকেই।