আব্দুল্লাহ আল মাসুদ
, ঝিনাইদহ
ইতিহাসের পাঠ নিতে সব সময় বইয়ের পাতা ওলটাতে হয় না। কখনো একটি পুরোনো মুদ্রাই খুলে দিতে পারে হারিয়ে যাওয়া কোনো সময়ের দরজা। ধাতব মুদ্রার গায়ে খোদাই করা চিহ্ন, শাসকের প্রতিকৃতি কিংবা তার নির্মাণশৈলী ধারণ করে থাকে একটি যুগের ইতিহাস। তেমনই ইতিহাসের নানা অধ্যায়কে নিজের কাছে আগলে রেখেছে ঝিনাইদহ শহরের মডার্ন মোড় এলাকার একটি ছোট্ট ঘর। সেখানে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর নানা সময়ের মুদ্রা, পুরোনো কাগুজে নোট, ডাকটিকিট, জমির দলিলের কপি ও দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী। আর এই সংগ্রহের নেপথ্যে রয়েছে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবির হাসান।
ঝিনাইদহ কালেক্টরেট স্কুলের শিক্ষার্থী আবিরের সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মুদ্রা। প্রাচীন সাম্রাজ্য থেকে ব্রিটিশ শাসন, সুলতানি ও মুঘল আমল পেরিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের প্রচলিত মুদ্রা-বিভিন্ন সময় ও অঞ্চলের মুদ্রা ঠাঁই পেয়েছে তার সংগ্রহশালায়। বয়সে কিশোর হলেও ইতিহাসের প্রতি তার আগ্রহ আর পুরোনো নিদর্শন সংগ্রহের নেশা তাকে গড়ে তুলেছে ব্যতিক্রমী এক সংগ্রাহক হিসেবে।
আবিরের সংগ্রহের দিকে চোখ রাখলে ধরা পড়ে ইতিহাসের বিচিত্র সব অধ্যায়। রয়েছে গুপ্ত সাম্রাজ্যের গান্ধার জনপদের মুদ্রা, শুঙ্গ ও মৌর্য আমলের মুদ্রা এবং সম্রাট অশোকের সময়ের মুদ্রা। আছে চীনের ‘ঘোস্ট কয়েন’, সুলতানি ও মুঘল আমলের মুদ্রা। ব্রিটিশ রাজা এডওয়ার্ডের ছবি-সংবলিত মুদ্রা এবং ব্রিটিশ শাসনামলে প্রচলিত ফুটো পয়সাও রয়েছে এই সংগ্রহে। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সেই সংগ্রহে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের বর্তমানে প্রচলিত পাঁচ টাকার কয়েনও।
মুদ্রার পাশাপাশি আবিরের সংগ্রহে রয়েছে বিভিন্ন দেশের পুরোনো কাগুজে মুদ্রা ও ডাকটিকিট। আছে শতবর্ষী পুরোনো জমির দলিলের কপি, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত নানা সামগ্রী এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। বঙ্গ অঞ্চলের বিভিন্ন সময়ের শাসনামলের মুদ্রাগুলো একসঙ্গে দেখার সুযোগ তার সংগ্রহের অন্যতম আকর্ষণ। প্রতিটি নিদর্শন যেন অতীতের কোনো না কোনো সময়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পরানপুর গ্রামে আবিরের পৈতৃক বাড়ি। তার বাবা কুতুব উদ্দিন মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। দাদাও ছিলেন শিক্ষক। বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা ঝিনাইদহ শহরের মডার্ন মোড় এলাকায় বসবাস করেন। ছয় শতক জমির ওপর নির্মিত বাড়িটির একটি কক্ষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে আবিরের সংগ্রহের জন্য। ঘরটি আকারে ছোট হলেও সেখানে জমেছে ইতিহাসের নানা সময়ের স্মারক।
তবে এত বড় সংগ্রহের শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ। পাঁচ বছর আগে এক বন্ধুর কাছ থেকে উপহার হিসেবে একটি পুরোনো ধাতব মুদ্রা পেয়েছিল আবির। সেই মুদ্রাটিই তার মনে পুরোনো জিনিসের প্রতি কৌতূহল তৈরি করে। একটি মুদ্রা থেকে শুরু, এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সংগ্রহের পরিধি। পুরোনো মুদ্রা খোঁজা, সেগুলো সংগ্রহ করা এবং বিভিন্ন সময়ের মুদ্রা সম্পর্কে জানার আগ্রহ একসময় তার নেশায় পরিণত হয়।
আবির হাসান বলে, ‘একটি পুরোনো মুদ্রা পাওয়ার পর থেকেই সংগ্রহের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর বিভিন্ন জায়গা ও মানুষের কাছ থেকে সুযোগ পেলেই মুদ্রা সংগ্রহ করেছি। দেশের অনেক সংগ্রাহকের সঙ্গেও আমার যোগাযোগ হয়েছে। অনেকে আমাকে মুদ্রা উপহারও দিয়েছেন।’
ছেলের এই আগ্রহে শুরু থেকেই উৎসাহ জুগিয়েছেন বাবা কুতুব উদ্দিন মিয়া। তার সহযোগিতায় বাড়ির একটি কক্ষ পেয়েছে আবিরের সংগ্রহ। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ইতিহাস ও পুরোনো জিনিসের প্রতি ওর আগ্রহ। প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করে এবং এসব সংগ্রহ করে-এটা আমারও ভালো লাগে। তাই ওকে সহযোগিতা করি। বাড়ির একটি ঘরও এসব সংগ্রহের জন্য দিয়েছি।’
আবিরের কাছে মুদ্রা মানে কেবল পুরোনো ধাতুর তৈরি কোনো বস্তু নয়। প্রতিটি মুদ্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নির্দিষ্ট সময়ের সমাজ, অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থার স্মৃতি। একটি মুদ্রা হাতে নিয়ে সে যেন ফিরে যেতে চায় সেই সময়ে, যখন সেটি মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনের অংশ ছিল। আর সেই কৌতূহল থেকেই একের পর এক মুদ্রা ও ঐতিহাসিক নিদর্শন নিজের সংগ্রহে যুক্ত করে চলেছে সে।
দশম শ্রেণিতে পড়া আবিরের এই উদ্যোগ কেবল ব্যক্তিগত শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্য দিয়ে অতীতের স্মারকগুলো সংরক্ষণের প্রতিও তৈরি হচ্ছে তার দায়বদ্ধতা। ভবিষ্যতে সংগ্রহ আরও বড় করার স্বপ্ন দেখে সে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ছোট্ট ঘরে হয়তো যুক্ত হবে আরও নতুন নিদর্শন। তখন এই ঘর আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে ইতিহাসের নানা অধ্যায়ে-যেখানে একটি মুদ্রা হাতে নিলেই উঁকি দেবে কোনো এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের গল্প।