যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

বিলের পানিতে হাঁস পালন: সম্ভাবনার সঙ্গে চাই পরিকল্পিত সহায়তা

প্রকাশ : সোমবার, ২৪ আগস্ট,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
বিলের পানিতে হাঁস পালন: সম্ভাবনার সঙ্গে চাই পরিকল্পিত সহায়তা

বিলের পানিতে হাঁস পালন একটি প্রাচীন পদ্ধতি। হাজার বছর ধরে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নারীরা এই কাজটি করে আসছেন। কিন্তু এই হাঁস পালনকে বাণিজ্যিক উদ্যোগে পরিণত করার ধারণা সাম্প্রতিক। বিল যেহেতু উন্মুক্ত জলাশয়, সেখানে প্রচুর প্রাকৃতিক খাদ্য থাকে। এই খাদ্যকে ব্যবহার করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা তাই খুবই ইতিবাচক।

রোববার সুবর্ণভূমিতে এমনই একটি খবর প্রকাশিত হয়, যেখানে বলা হয়েছে, বিলসমৃদ্ধ নড়াইল জেলায় এখন হাঁসের খামার গড়ে তুলে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যখন বিলে পর্যাপ্ত পানি থাকে, তখন এই কারবার খুবই লাভজনক হয়ে ওঠে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র ছয়-সাত মাসের মৌসুমি খামার থেকে দুই থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন অনেক খামারি। দেড় কোটি হাঁসের ডিম উৎপাদন এবং এর বাজারমূল্য ২২ কোটি টাকার বেশি- এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কৃষিনির্ভর ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানবঞ্চিত নড়াইলে এমন উদ্যোগকে তাই নিছক ব্যক্তিগত ব্যবসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির একটি কার্যকর মডেল।

বিলের পানিতে হাঁস পালনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। প্রাকৃতিক জলাশয়ে বিচরণ করে হাঁস নানা ধরনের প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণ করে। ফলে প্রচলিত খামারের তুলনায় খাবারের ব্যয় কমে যায়। অন্যদিকে প্রায় ৯০ শতাংশ হাঁস নিয়মিত ডিম দেওয়ায় খামারিরা দ্রুত আয় করতে পারেন। কৃষিকাজে সীমিত লাভ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিল্পায়নের দুর্বলতার মধ্যে এ ধরনের উদ্যোগ তরুণদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই সম্ভাবনাকে টেকসই করতে হলে শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বর্তমানে নড়াইলে হাঁসের সংখ্যা ও খামারের পরিমাণ বাড়লেও প্রশিক্ষণ, উন্নত জাত, রোগ প্রতিরোধ, টিকা, সাশ্রয়ী খাদ্য, চিকিৎসা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বর্ষা মৌসুমের অস্থায়ী খামারগুলো অনেকাংশেই বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়া, হাঁসের মৃত্যুহার বৃদ্ধি, ডিমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে ডিম বিপণনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। খামারিরা প্রতিটি ডিম ১৫ টাকা দরে বিক্রি করলেও ভোক্তা পর্যায়ে সেই ডিম কত দামে বিক্রি হচ্ছে, তার সঙ্গে খামারির প্রাপ্ত মূল্যের ব্যবধান কত- এসব বিষয়ে নজরদারি থাকা জরুরি। খামারিদের সমবায়ভিত্তিক সংগঠন গড়ে তুলে সরাসরি বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা গেলে তারা যেমন ন্যায্যমূল্য পাবেন, তেমনি ভোক্তারাও তুলনামূলক স্থিতিশীল দামে ডিম কিনতে পারবেন।

এ ক্ষেত্রে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের ভূমিকা আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। শুধু প্রশিক্ষণ ও টিকা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রত্যেক বিলাঞ্চলের জন্য হাঁস পালনের উপযোগী পরিকল্পনা, রোগ ব্যবস্থাপনা, খামারি নিবন্ধন, উৎপাদন ও বাজারের তথ্য সংরক্ষণ এবং নিয়মিত পরামর্শসেবা চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে সফল মৌসুমি খামারিরা ধীরে ধীরে স্থায়ী খামারিতে রূপান্তরিত হতে পারেন।

বিলের পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যাবে না। প্রাকৃতিক খাদ্য ও জলজ পরিবেশের ওপর নির্ভর করেই এ পদ্ধতি লাভজনক হচ্ছে। তাই অতিরিক্ত হাঁসের চাপ, পানি দূষণ, কীটনাশকের ব্যবহার কিংবা জলাভূমির স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। পরিবেশবান্ধব হাঁস পালন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

নড়াইলের বিলাঞ্চলে হাঁস পালন দেখিয়ে দিয়েছে, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান না থাকলেও স্থানীয় সম্পদ ও মানুষের উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। তিন শতাধিক কৃষক ও তরুণের এই উদ্যোগ আরও হাজারো মানুষের জীবিকার পথ তৈরি করতে পারে। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, সহজ অর্থায়ন, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায্য বাজারব্যবস্থা।

তাই নড়াইলের বিলের হাঁসের খামারকে সাময়িক বর্ষাকালীন উদ্যোগ হিসেবে না দেখে সম্ভাবনাময় গ্রামীণ শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সরকারি সহায়তা ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ে এ খাতকে সংগঠিত করা গেলে একদিকে যেমন বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে দেশের ডিম ও প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণেও নড়াইল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। বিলের পানিতে হাঁসের এই সম্ভাবনাকে টেকসই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া দরকার।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)