যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সুবর্ণভূমি: যশোরের সাংবাদিকতায় নতুন এক পথচলা

আকরামুজ্জামান

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর,২০২৬, ০১:০০ এ এম
সুবর্ণভূমি: যশোরের সাংবাদিকতায় নতুন এক পথচলা

একটি সংবাদপত্রের জন্ম মানে শুধু নতুন একটি প্রকাশনা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি সময়, একটি জনপদ এবং মানুষের কথা বলার নতুন একটি জায়গা। রাজধানীর বাইরে একটি সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করা তাই সহজ কাজ নয়। সীমিত বাজার, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, পাঠকের বদলে যাওয়া অভ্যাস, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন—সবকিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে হয়। সেই বাস্তবতার মধ্যেই যশোরে সুবর্ণভূমির পথচলা।

আমার জানা মতে, সুবর্ণভূমির এই যাত্রা প্রিন্ট দিয়ে শুরু হয়নি। ছাপা সংবাদপত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল হিসেবেও এর পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংবাদজগতে তখন এটি ছিল সক্রিয় একটি প্ল্যাটফর্ম। দ্রুত সংবাদ প্রকাশ, স্থানীয় ঘটনাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পাঠকের কাছে সরাসরি পৌঁছে যাওয়ার সুযোগের কারণে অল্প সময়েই তৈরি হয়েছিল একটি নিজস্ব পাঠকগোষ্ঠী।

কিন্তু সংবাদমাধ্যমের পথ সব সময় মসৃণ থাকে না। একটি প্রতিকূল সময়ে ভিন্নমত ও স্বাধীন সাংবাদিকতা চর্চার কারণে সেই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে সুবর্ণভূমির। একটি সংবাদমাধ্যমের জন্য এমন অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে বড় পরীক্ষা। তবে প্রতিকূল সময়ই অনেক সময় বলে দেয়, কোনো প্রতিষ্ঠান তার বিশ্বাস ও কাজের জায়গায় কতটা দৃঢ়।

সুবর্ণভূমি থেমে থাকেনি। পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নতুন করে পথচলার চেষ্টা করেছে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ের নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ডিক্লারেশন লাভ করে পত্রিকাটি। অনলাইন থেকে প্রিন্ট এবং অল্পসময়ের মধ্যে মাল্টিমিডিয়া প্লাটফর্মে আত্মপ্রকাশ তাই কেবল মাধ্যম পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি একটি সংবাদপ্রতিষ্ঠানকে নতুন করে গড়ে তোলারও গল্প।

যশোরের সাংবাদিকতার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এই জনপদে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সেই সাংবাদিকতার ধরনও বদলেছে। একসময় সংবাদ পাওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল ছাপা কাগজ। এখন সেই জায়গায় যুক্ত হয়েছে অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোনসহ নানা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ফলে একটি আধুনিক সংবাদপত্রের সামনে এখন দুটি কাজ—প্রিন্টের ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং ডিজিটালের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। এই জায়গায় স্থানীয় সংবাদপত্রের গুরুত্ব আলাদা।

জাতীয় গণমাধ্যমের নিজস্ব পরিসর রয়েছে। কিন্তু একটি গ্রামের ভাঙা রাস্তা, কৃষকের মাঠের সমস্যা, স্থানীয় ব্যবসায়ীর সংকট, কোনো বিদ্যালয়ের অব্যবস্থাপনা, নাগরিক দুর্ভোগ কিংবা একজন সাধারণ মানুষের সাফল্যের গল্প সব সময় জাতীয় সংবাদমাধ্যমে জায়গা পায় না। স্থানীয় সংবাদপত্রের শক্তি এখানেই। তারা মানুষের কাছাকাছি থাকে, ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকে এবং একটি জনপদের ছোট-বড় পরিবর্তনগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরতে পারে।

যশোরের মতো বৈচিত্র্যময় একটি জনপদের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতি থেকে অর্থনীতি, কৃষি থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা থেকে সংস্কৃতি, সীমান্ত থেকে নাগরিক জীবন—প্রতিদিনই এখানে তৈরি হচ্ছে অসংখ্য গল্প। আজকের একটি স্থানীয় সংবাদ হয়তো আগামী দিনে হয়ে উঠতে পারে একটি সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

তাই একটি সংবাদপত্রের সাফল্য শুধু তার প্রচারসংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। তার বড় পরিচয় তৈরি হয় মানুষের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করা, একাধিক সূত্র থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া, সংবাদ ও মতামতের মধ্যে পার্থক্য রাখা এবং ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অযথা পক্ষপাত না করা—এসবই একটি সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি। এই জায়গায় সুবর্ণভূমির সামনে যেমন সম্ভাবনা আছে, তেমনি আছে দায়িত্বও।

পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক আহসান কবীর যশোরের সাংবাদিকতায় দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। ঢাকার বাইরে সাংবাদিকতায় গুণ ও মান—দুই বিচারে যে ক’জন সাংবাদিককে আলাদাভাবে মনে রাখতে হয়, আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় তিনি তাদের একজন। সাংবাদিকতার প্রতি দায়বদ্ধতা, অনুসন্ধিৎসু মন, সংবাদকে গভীরভাবে দেখার চেষ্টা এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার সক্ষমতা তার সাংবাদিকতা-জীবনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বিশ্বাসযোগ্যতা। এটি এক দিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিন মাঠে কাজ করা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, সংবাদকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা এবং পেশাগত দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে ওঠে। আহসান কবীরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সুবর্ণভূমির সংবাদচর্চায়ও একটি স্বাভাবিক প্রভাব ফেলেছে।

গণমাধ্যমটিতে এখন প্রকাশক-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যশোরের ব্যবসায়ী মহলে পরিচিত এজাজ উদ্দীন টিপু। একটি সংবাদমাধ্যম পরিচালনায় সাংবাদিকতার পাশাপাশি প্রয়োজন সাংগঠনিক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা। উদ্যোক্তার এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি সংবাদপ্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে একটি সংবাদপত্র কখনোই একজন বা দুজন মানুষের একক প্রচেষ্টায় দাঁড়িয়ে থাকে না। সম্পাদক, রিপোর্টার, ফটোসাংবাদিক, সম্পাদনা সহকারী, মুদ্রণ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের সম্মিলিত শ্রমেই প্রতিদিন একটি পত্রিকা পাঠকের হাতে পৌঁছে। ‘সুবর্ণভূমি’র পথচলার পেছনেও রয়েছে সেই সম্মিলিত শ্রম।

যশোরে পত্রিকাটির নান্দনিক অফিস এবং প্রযুক্তির ব্যবহারও প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ ভাবনার একটি দিক তুলে ধরে। তবে প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, সংবাদমাধ্যমের মূল শক্তি শেষ পর্যন্ত সংবাদেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি খবর কয়েক সেকেন্ডে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু দ্রুততা কখনো সত্যতার বিকল্প হতে পারে না। বরং দ্রুতগতির এই সময়ে যাচাই করা তথ্য, নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

সুবর্ণভূমির সামনে আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ হবে দ্রুততার সঙ্গে নির্ভুলতার সমন্বয় করা। প্রিন্ট সংস্করণের মর্যাদা ধরে রেখে ডিজিটাল সাংবাদিকতার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো, নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে পৌঁছানো এবং একই সঙ্গে সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিগুলো অক্ষুণ্ন রাখা—এই ভারসাম্যই ভবিষ্যৎ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ হবে।

দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ তাই শুধু উদযাপনের সময় নয়, আত্মমূল্যায়নেরও সময়। কোথা থেকে শুরু হয়েছিল, কোন পথ পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে এবং আগামী দিনে কোথায় যেতে চায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময়ও এটি।
আমার প্রত্যাশা, সুবর্ণভূমি শুধু যশোরের একটি সংবাদপত্র হয়ে থাকবে না; ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠবে এই অঞ্চলের সাংবাদিকতার একটি শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান। সংবাদে থাকবে সত্যের প্রতি দায়, অনুসন্ধানে থাকবে সাহস, বিশ্লেষণে থাকবে গভীরতা এবং মতপ্রকাশে থাকবে বৈচিত্র্য।

দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণের এই শুভক্ষণে সুবর্ণভূমি পরিবারের প্রতি রইলো আন্তরিক শুভ কামনা। পত্রিকাটির পথচলা আরও বিস্তৃত হোক, পাঠকের আস্থা আরও গভীর হোক এবং যশোরের মানুষের কথা বলার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে সুবর্ণভূমি আরও প্রতিষ্ঠিত হোক।

কারণ একটি ভালো সংবাদপত্র শুধু সংবাদ প্রকাশ করে না। সে তার সময়কে ধরে রাখে, মানুষের কথা বলে, নীরব মানুষের কণ্ঠস্বর সামনে আনে এবং শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের কাছে রেখে যায় একটি সময়ের সাক্ষ্য। ‘সুবর্ণভূমি’র পথচলাও তেমনই হোক—একটি পত্রিকার সীমা ছাড়িয়ে একটি জনপদের স্মৃতি, মানুষের কণ্ঠ এবং সময়ের বিশ্বস্ত দলিল হয়ে ওঠার পথচলা।

লেখক: সভাপতি, সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোর

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)