যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

পানিতে ডুবে সাতক্ষীরায় দশ মাসে ঝরেছে ২২ প্রাণ

আসাদুজ্জামান সরদার

, সাতক্ষীরা

প্রকাশ : শনিবার, ২৪ অক্টোবর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
পানিতে ডুবে সাতক্ষীরায় দশ মাসে ঝরেছে ২২ প্রাণ

পানিতে ডুবে প্রাণ হারানোর ঘটনা কিছুতেই থামছে না। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে পহেলা অক্টোবর পর্যন্ত সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পুকুর, নদী, খাল ও মাছের ঘেরে ডুবে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

নিহতদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে ১৯ জনই শিশু। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের অগোচরে খেলতে গিয়ে কিংবা গোসল করার সময় অসাবধানতাবশত এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে।

মাসভিত্তিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, মে থেকে সেপ্টেম্বরের পাশাপাশি অক্টোবরের শুরুতেও পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে-সাঁতার না জানা, পুকুর বা জলাশয়ের ধারে অভিভাবকহীন অবস্থায় খেলাধুলা করা এবং হঠাৎ চোখ সরিয়ে নেওয়াতেই একেকটি তাজা প্রাণ নিভে গেছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে পহেলা অক্টোবর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে একজন (অজ্ঞাত), ফেব্রুয়ারিতে দুইজন (একজন বৃদ্ধ, এক শিশু), মার্চে তিন শিশু, এপ্রিলে এক শিশু, মেতে দুই শিশু, জুনে তিন শিশু, জুলাইয়ে চারজন (একজন নারী, তিন শিশু), আগস্টে তিন শিশু, সেপ্টেম্বরে ছয়জনের মধ্যে একজন বৃদ্ধা, পাঁচ শিশু এবং পহেলা অক্টোবরে দুই শিশু সর্বমোট ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ শিশু, একজন বৃদ্ধা, একজন বৃদ্ধ ও একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি রয়েছেন।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর একদিনেই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পৃথক ঘটনায় চার শিশু ও এক কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই দিন আশাশুনির বামনডাঙ্গা গ্রামে ১৩ মাস বয়সী শিশু ঈশিতা সানা, কলারোয়ার কেড়াগাছিতে দুই বছরের শিশু ইরফান খাঁ, শ্যামনগরের চন্ডিপুরে কিশোর ফয়সাল হোসেন, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ীতে এক কন্যাশিশু এবং কালিগঞ্জের ইন্দ্রনগরে ১৯ মাস বয়সী লামিসা খাতুন পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের শুরুতে পানিতে ডুবে মৃত্যুর একাধিক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।

১৮ সেপ্টেম্বর কালিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে নানাবাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে মারা যায় দুই শিশু- সোনাতলার আজগার আলীর ছেলে আব্দুল্লাহ (৮) এবং কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের আমিনুর বিশ্বাসের ছেলে ইকবাল হোসেন (৭)।

২৭ সেপ্টেম্বর তালা উপজেলার মহান্দী গ্রামে পুকুরের পানিতে ডুবে রাফসান হোসেন (৩) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে প্রবাসী শেখ রাশেদ হোসেনের ছেলে। দুপুরে অসাবধানতাবশত বাড়ির পাশের পুকুরে পড়ে সে মারা যায়।

পহেলা অক্টোবর কলারোয়া উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের সিংহলাল গ্রামে পুকুরের পানিতে ডুবে দুই সহোদর শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। বেলা ১২টার দিকে পরিবারের সদস্যদের অগোচরে পানিতে পড়ে মারা যায় সিংহলাল গ্রামের মুহাম্মদ ইকবাল হোসেনের কন্যা জান্নাতুল (৩) ও ছেলে সানজাদুল (২)। একসঙ্গে দুই সন্তানকে হারিয়ে পুরো গ্রাম শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

ডিজাস্টার ফোরামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পানিতে ডুবে ৫৮২ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী ২৫২ জন এবং ছয় থেকে দশ বছর বয়সী ১৫১ জন শিশু রয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে পানিতে ডুবে এক হাজার ৩১১ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল, যার মধ্যে এক হাজার ১৮৪ জনই ছিল শিশু (প্রায় ৯১ শতাংশ)। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৬৩১ জনের বয়স ছিল এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে। ওই সময়ে পুকুরে ডুবে ৭৬৫ জন, নদীতে ডুবে ১৮৫ জন এবং মাছের ঘের ও ডোবার পানিতে ডুবে ১০৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছর বয়সে সাঁতার শেখানো হলে একটি শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে প্রায় ৯০ দশমিক ৩ শতাংশ সুরক্ষিত থাকে। ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, গ্রাম ও শহরকেন্দ্রিক পরিবারগুলোর সচেতনতার অভাব, গাফিলতি এবং অবহেলার কারণেই পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। তাই শিশুদের সুরক্ষায় পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারিভাবে সাঁতার প্রশিক্ষণসহ কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

সাতক্ষীরা জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাতক্ষীরা স্থানীয় এনজিও উত্তরণের মাধ্যমে আইসিবিসি নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা ও শ্যামনগর উপজেলায়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধ করে শিশুর মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটানো, যদিও এটি ২০২৫ সালে শেষ হয়েছে। আমরা এই প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের জন্য অপেক্ষা করছি। বর্তমানে সাতক্ষীরায় আমাদের কোনো প্রকল্প চলমান নাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘অভিভাবকদের অবশ্যই তাদের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। আর পাঁচ বছরের পর তাদের সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা কেবল দুটি উপজেলায় সীমিত পরিসরে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আমরা ৫০টি পুকুরের মাধ্যমে ২২ হাজার ৫০০ শিশুকে সাঁতার শেখাতে সক্ষম হয়েছি। আর এই প্রকল্পের আওতায় যেসব অরক্ষিত জলাশয় বা পুকুর ছিল, সেগুলোতে সুরক্ষা বেষ্টনী দেওয়া হয়েছিল।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)