বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
আগামী ২৭ এপ্রিল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যশোর সফর করবেন। এটি হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তার প্রথম সফর। তার এই সফর ঘিরে যশোরে এখন সাজ সাজ রব।
প্রধানমন্ত্রীর দিনভর কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে উলাশী-যদুনাথপুর খাল পুনঃখনন, যশোর সরকারি মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি ও যশোর ক্লাব পরিদর্শন এবং বিএনপির জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতাদান।
প্রধানমন্ত্রীর যশোর সফর সফল করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জোর তৎপরতা চলছে। নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয়াদি পর্যালোচনা করতে দফায় দফায় সভা হচ্ছে। জনসভা ও খাল খনন কর্মসূচিতে বিপুল মানুষের সমাগমের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে বিএনপি।
সরকারি কর্মসূচি অনুযায়ী ওই দিন সকাল সোয়া ১০টায় প্রধানমন্ত্রী যশোর বিমানবন্দরে নামবেন। সেখান থেকে সোজা চলে যাবেন শার্শা উপজেলার উলাসীতে। সেখানে উলাসী-যদুনাথপুর খাল পুনঃখনন কাজ উদ্বোধন করবেন তিনি। এর পরপরই উলাসীতে অনুষ্ঠেয় সুধী সমাবেশে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
বেলা সোয়া ১টায় তিনি যশোর মেডিকেল কলেজে উপস্থিত হয়ে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। সেখান থেকে শহরের কেন্দ্রস্থলে ফিরে তিনি যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করবেন। সার্কিট হাউজে নামাজ ও দুপুরের খাবার গ্রহণ শেষে তিনি কেন্দ্রীয় ঈদগাহে যশোর জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় যোগ দেবেন বিকাল সাড়ে ৩টায়। জনসভা শেষে তিনি যশোর ক্লাব পরিদর্শন এবং সেখানে নামাজ আদায় শেষে সার্কিট হাউজ ঘুরে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হতে বিমানবন্দরে যাবেন।
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করতে গেল সপ্তাহজুড়ে যশোরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। ইতিমধ্যে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) অগ্রবর্তী দল যশোর এসে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাজ করছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সফর সংক্রান্ত সমন্বয় সভা হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি দপ্তরের প্রধানরা ছাড়াও এসএসএফের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন যশোর জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খান খোকন। সভায় এসএসএফের পরিচালক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন বলে জানান সেখানে উপস্থিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম।
প্রধানমন্ত্রী ২৭ তারিখ যশোরের যে খালটি পুনঃখনন করবেন সেটি শার্শা উপজেলার মধ্যে অবস্থিত। এই খালটি খননের মাধ্যমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে তার সাড়াজাগানো খাল খনন কর্মসূচির সূচনা করেছিলেন। দীর্ঘ অবহেলার কারণে সেই খালটি মজে গেছে। নতুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার বাবার স্মৃতিবিজড়িত খালটি পুনঃখনন করতে আসছেন জেনে ওই এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়েছে।
উলাসী-যদুনাথপুর খালটি পুনঃখনন কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এই দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জি সুবর্ণভূমিকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে তারা এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে পারবেন না। তবে দপ্তরের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, উলাশীতে খাল পুনঃখননস্থল ইতিমধ্যে অনুষ্ঠানের উপযোগী করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজও সন্তোষজনক গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নির্মাণকাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ হলো গণপূর্ত অধিদপ্তর। এই দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘ভিত্তিফলক তৈরি হয়ে গেছে। অন্যান্য কাজ শনিবারের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যাবে বলে আমরা আশা করছি।’
প্রধানমন্ত্রী যশোর সফরকালে আরও যে দুটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করবেন, সে দুটি ঐতিহ্যবাহী। এর একটি হলো যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি। যশোর ইনস্টিটিউট হলো বেসরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক সংগঠন। ১৯২৭ সালে আর্য থিয়েটার, টাউন ক্লাব ও লাইব্রেরিকে একীভূত করে রায়বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার ‘যশোর ইনস্টিটিউট’ নামে একক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বর্তমানে যশোর ইনস্টিটিউটের অংশ পাঠাগার ১৮৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত, এবং এটি উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ পাবলিক লাইব্রেরি। তালপাতার পাণ্ডুলিপিসহ আরবি, ফার্সি, উর্দু ভাষার প্রাচীন গ্রন্থ ছাড়াও লক্ষাধিক বাংলা ও ইংরেজি বইসমৃদ্ধ এই পাঠাগারটি পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
যশোর ইনস্টিটিউট পরিচালনা পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু সুবর্ণভূমিকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে তারা যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। এখন শেষ সময়ে রঙ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। প্রসঙ্গত, এই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পরিষদের নির্বাচন আজ শুক্রবার। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার মাত্র দুই দিন পর প্রধানমন্ত্রী এখানে আসছেন।
অন্যদিকে, যশোর ক্লাব হলো এই জেলার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ শাসনামলে মূলত এটি ছিল অফিসার্স ক্লাব। এই ক্লাবের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক স্থানীয় দৈনিক লোকসমাজের প্রকাশক শান্তনু ইসলাম সুমিত। তিনি সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘কিছুসময় আগে আমরা জানতে পারলাম, প্রধানমন্ত্রী যশোর ক্লাব পরিদর্শন করবেন। ফলে পরিচ্ছন্নতাসহ অন্যান্য কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন করবেন, তাই যশোর ক্লাবের কিছু সংস্কার কাজ দ্রুতই শুরু করা হচ্ছে। যশোর জেলা পরিষদের প্রশাসকও একই তথ্য দেন।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টায় শহরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতা করবেন। এই জনসভা সফলের লক্ষে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে দলটি। যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন সুবর্ণভূমিকে বলেন, জনসভায় বিপুল জনসমাগমের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতিমূলক কাজ করা হচ্ছে। প্রথমেই প্রত্যেক উপজেলা ও পৌর কমিটির সভা করা হয়েছে। এরপর ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সভা করে নেতাকর্মীদের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। এছাড়া বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর সর্বপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঠে নামাতে প্রতিদিনই একাধিক বৈঠক হচ্ছে।
জনসভা উপলক্ষে গত মঙ্গলবার দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস বেগমের নেতৃত্বে প্রচারপত্র বিলি শুরু হয়েছে, যা চলমান থাকবে। বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে মাইকে প্রচারণা। প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংগঠনের ব্যানারে প্রচার মিছিল বের হচ্ছে। আজ শুক্রবার যশোর সদর আসনের সংসদ সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যশোর আসছেন। তিনি এসে জনসভাসহ অন্যান্য কর্মসূচির প্রস্তুতিমূলক কাজের নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন বলে দলীয় সূত্রে বলা হয়েছে।
শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন সুবর্ণভূমিকে জানান, উলাশীতে খাল পুনঃখনন ও সেখানে অনুষ্ঠেয় সুধী সমাবেশ সফল করতে তারা নির্ঘুম তৎপরতা চালাচ্ছেন।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে যশোর শহর ও আশপাশের এলাকায় প্রচারণা সামগ্রী স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। তবে প্যানা, বিলবোর্ড, ব্যানার যাতে অনেক বেশি স্থাপন না করা হয়, বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা কর্মীদের প্রতি সেই আহ্বান জানাচ্ছেন। কারণ প্রধানমন্ত্রী বাহুল্য খরচ পছন্দ করেন না বলে জেলা বিএনপি নেতাদের ভাষ্য।