দেহঘড়ি
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
গোঁফ বা মোচ হলো ওষ্ঠের ওপরে গজানো চুল। সাধারণত কারো গোঁফ আছে বলা হলে মনে করা হয় তার ওষ্ঠের ওপরের অংশটুকুতেই তা সীমাবদ্ধ আছে। কারণ গাল ও থুঁতনির অন্যান্য অংশে গজানো চুলকে দাড়ি বলা হয়। বয়সন্ধিকালে ছেলেদের গোঁফ ওঠা শুরু হয়। নিওলিথিক বা নব্য প্রস্তর যুগ থেকেই পাথরের ক্ষুর দিয়ে ক্ষৌরি করার চল শুরু হয়, আর এই সুদীর্ঘকালের ব্যবধানে গোঁফের নানান রকম ফ্যাশন চালু হয়েছে। যারা গোঁফ রাখেন, তারা নিয়মিত ছেঁটে ও চিরুনি দিয়ে আঁচড়িয়ে এটার যত্ন নেন।
আবার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দীর্ঘ ও সযত্নে রক্ষিত গোঁফের প্রতিযোগিতা হয়। বিশ্ব দাড়ি ও গোঁফ চ্যাম্পিয়নশিপে ছয়টি উপবিভাগে গোঁফের বিভাজন করা হয়। গোঁফের এমন কদর দেখেই কি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ননসেন্স ছড়াকার সুকুমার রায় বলেছিলেন, ‘গোঁফকে বলে তোমার আমার গোঁফ কি কারো কেনা? গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ দিয়ে যায় চেনা।’
প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের শরীরে যত রকমের কেশ রয়েছে, তার মধ্যে গোঁফ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিবিশেষে মাথার চুলের চেয়ে গোঁফের মর্যাদা বেশি হতে পারে। স্পেনিশ চিত্রশিল্পী সালভাদর দালির শিল্পকর্ম যত বিখ্যাত, তার চেয়ে কম খ্যাতি নয় তার গোঁফের। আশির দশকে তিনি যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন তার গোঁফ নিয়ে বিপদে পড়েছিলেন চিকিৎসকেরা। গোঁফ না কাটলে লাইফসাপোর্ট যন্ত্রপাতি নাকে-মুখে লাগানো যাচ্ছে না। যদিও তিনি অচেতন, তবু কার সাধ্য তার গোঁফ কাটেন? চিকিৎসকেরা এক বুদ্ধি বের করলেন। বললেন, আপাতত গোঁফ জোড়া কেটে সরিয়ে রাখি। গোঁফের চেয়ে তার জীবনের দাম অনেক বেশি। অবশ্য দালির প্রাণবায়ু বের হওয়া মাত্রই গোঁফজোড়া আঠা দিয়ে জায়গা মতো সেঁটে দেওয়া হয়।
রবীন্দ্রনাথ একবার নজরুলকে বলেছিলেন, ‘তুমি তলোয়ার দিয়ে দাড়ি কাটছ, ও-কাজটির জন্য ক্ষুরই উপযুক্ত। এখন তলোয়ার পাওয়া যায় না বলে দা দিয়েও চুল-গোঁফ কাটা হয়।’ বাংলা ভাষার একটি বিখ্যাত প্রবাদ হচ্ছে ‘মাসির গোঁফ থাকলে মামা হতো’। এই মাসি কিন্তু শুধু আত্মীয় মাসি নয়। বদমেজাজি যে কোনো নারীই এই মাসি।
প্রকৃতি কতগুলো নিজস্ব বিচিত্র নিয়ম মেনে চলে। কোনো জীবের সারা শরীরে রোম, কারো বা দুটো পাখা। মোটামুটি স্তন্যপায়ী জীবের শরীরে রোম আর পাখিদের হয় পাখা। একদিকে চুল যেমন শরীরের উষ্ণতাকে বজায় রাখে তেমনি রোদের ঝলসানি থেকেও বাঁচায়। স্পর্শের অনুভবে সাহায্য করে। জš§ানোর সময় বাচ্চাদের শরীরে হালকা রোম থাকে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ তা কড়া হয়ে ওঠে। কিশোর-কিশোরীদের যৌবনোদ্গম ঘটে এগারো থেকে ষোল বছর বয়সের মধ্যে। কিশোরদের ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ আর অন্যান্য যৌনগ্রন্থি ‘এন্ড্রোজেন’ নামে এক রকম যৌন হরমোন তৈরি করে শরীরে ছাড়তে থাকে। আর কিশোরীদের বেলায় তাদের অণ্ডাশয় থেকে যে যৌন হরমোন বের হয় তার নাম ‘এস্ট্রোজেন’। এন্ড্রোজেনের কাজ হলো মুখে, বুকে চুলদাড়ির জš§ দেওয়া, কণ্ঠস্বর ভারী করে তোলা। আর এস্ট্রোজেনের কাজ হলো মেয়েদের স্তনের আকার বড় করা। স্ত্রী-পুরুষ উভয়েরই শরীরে এই হরমোন দুটি অনেক অদল-বদল ঘটায়। একদিকে মেয়েদের শরীর যেমন কমনীয় হয়ে ওঠে, অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে হয় কিছুটা কর্কশ। সোজা কথায়, এন্ড্রোজেন ক্ষরণ না হওয়ায় মেয়েদের দাড়ি-গোঁফ হয় না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘গোঁফ ও ডিম’ প্রবন্ধে লিখেছেন ‘সকলেই বলিতেছেন, এখানে গোঁফ না বলিয়া গুম্ফ বলা উচিত ছিল। আমি বলিতেছি তাহার কোনো আবশ্যক নাই। গোঁফটা কিছু এমন একটা হেয় পদার্থ নহে যে, তাহাকে সংস্কৃত গঙ্গাজলে না ধুইয়া ভদ্রসমাজে আনা যায় না।’ গোঁফ আসলে পৌরুষত্বের প্রতীক। গোঁফকে অনেক বলেন Mustache is a symbol of male vanity. অবশ্য যারা সুন্দর গোঁফের অধিকারী তারা এ ধরনের কথা বলতে পারেন। আবার প্রবাদ আছে ‘শিকারী বিড়াল গোঁফে চেনা যায়’। এটার অর্থ এই নয় যে, বাকি বেড়ালগুলো গোঁফ ছাড়াই চেনা যায়।
গোঁফ প্রাণীদেরও কাজে লাগে। বিড়াল তার দেহের তুলনায় ছোট গর্ত দিয়ে যখন বের হতে গিয়ে তার গোঁফকে কাজে লাগাতে পারে। কারণ গর্তে প্রশস্ততায় গোঁফ ঠেকিয়ে সে অনুমান করে নিতে পারে, গর্ত বা সংকীর্ণ জায়গাটি দিয়ে তার পক্ষে পার হওয়া সম্ভব কি না। আবার অন্ধকার ঘরে বেড়াল যখন ঘোরাফেরা করে, তখনো গোঁফ তার কাজে লাগে। ঝোপের মধ্যে লাফালাফি অথবা ইঁদুর ধরার সময়ও গোঁফ তার মোক্ষম অস্ত্র। এই কারণে প্রাণীবিজ্ঞানীরা বলেন, বেড়ালের জন্য গোঁফ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭৮ সালের ঘটনা। হলিউড তারকা জেন হ্যাকম্যান সুপারম্যান ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পান। ছবির পরিচালক ডিক ডোনার বললেন, চরিত্রের প্রয়োজনে তাকে টেকো হতে হবে। পাশাপাশি সাধের গোঁফজোড়াও কামাতে হবে। টেকো সাজতে হেডক্যাপ পরতে রাজি হলেন হ্যাকম্যান, কিন্তু গোঁফ কামাতে রাজি হলেন না। অনেক অনুনয় করেও ডোনার যখন তাকে টলাতে পারলেন না, তখন তিনি বললেন, ‘তুমি যদি তোমার গোঁফ কামাও, তাহলে আমিও আমার গোঁফ উধাও করব।’
অনিচ্ছা সত্ত্বেও হ্যাকম্যান গোঁফ কামিয়ে ফেললেন। ডোনারও তার কথামতো নিজের গোঁফ গায়েব করে দিলেন। অবশ্য ডোনারের গোঁফ ছিল নকল। ডোনারের এই মহাচালাকিতে হো হো করে হাসা ছাড়া উপায় ছিল না হ্যাকম্যানের।