যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

মানবিক আশ্রয়, তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কঠোর নিষেধাজ্ঞা

ভারতে বসে চলবে না হাসিনার রাজনীতি

প্রত্যর্পণ আবেদন ভারতীয় আইনে পর্যালোচনায়

সুবর্ণভূমি ডেস্ক

প্রকাশ : শনিবার, ১ আগস্ট,২০২৬, ১২:০২ এ এম
ভারতে বসে চলবে না হাসিনার রাজনীতি

ভারতে আশ্রয়ে থাকা বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের তোড়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে দেশের মাটিতে বসে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবেন না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে ভারত সরকার। একই সঙ্গে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার করা আনুষ্ঠানিক আবেদন ভারতীয় আইন ও বিধি অনুযায়ী পর্যালোচনার অধীন রয়েছে বলেও জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

শুক্রবার দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী সংসদীয় কমিটিকে দেওয়া ব্রিফিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনার অবস্থান, প্রত্যর্পণ আবেদন এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।
ভারতের অবস্থান স্পষ্ট

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, গুরুতর বিপদ বা প্রাণনাশের আশঙ্কায় থাকা ব্যক্তিদের মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দেওয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভারতের রয়েছে। সেই নীতির অংশ হিসেবেই শেখ হাসিনাকে সেখানে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

তবে, একই সঙ্গে ভারত একটি মৌলিক নীতি অনুসরণ করে বলে জানানো হয়েছে-ভারতের ভূখণ্ড কোনো অবস্থাতেই অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা যাবে না। ফলে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলেও সেখান থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাবেন না।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে নয়াদিল্লি একদিকে মানবিক অবস্থান বজায় রাখার বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রশ্নে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না-এমন একটি স্পষ্ট নীতিগত অবস্থানও তুলে ধরেছে।

প্রত্যর্পণ নিয়ে কী বলছে ভারত

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর যে আবেদন করা হয়েছে, তা ভারতীয় আইন ও বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে রয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে। অর্থাৎ এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা ভারত প্রকাশ করেনি।

এদিকে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন তাৎপর্য

সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশে ফেরার সম্ভাবনার কথা আলোচনায় আসে। এটা নিয়ে স্বয়ং শেখ হাসিনা এবং তার অনুসারীরা সোস্যাল মিডিয়ায় নানা পোস্টও দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, ভারতে বসে রেকর্ড করা শেখ হাসিনার ভিডিও ও অডিও ক্লিপও সোস্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে দিচ্ছে দলটির আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা। ফলে বিষয়টি বাংলাদেশের ও ভারতের রাজনীতিতে এখনকার নিয়মিত চর্চার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ঠিক সেই সময় ভারতের এই অবস্থানকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান শুরু থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম আলোচিত ইস্যু। ভারতের সর্বশেষ অবস্থান অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে-আশ্রয় দেওয়া এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া-এই দুটি বিষয়কে ভারত আলাদা করে দেখছে।
সংসদীয় কমিটির সুপারিশ

কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটি তাদের ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ভারত সরকারকে বর্তমান মানবিক ও নীতিগত অবস্থান অব্যাহত রাখার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে পুরো বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভিসা, গঙ্গা চুক্তি ও সংখ্যালঘু ইস্যুও গুরুত্ব পেয়েছে

শেখ হাসিনার প্রসঙ্গের পাশাপাশি প্রতিবেদনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।

কমিটি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ভিসা সীমিত থাকায় দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রায় দুই বছর পর্যটন ভিসা বন্ধ থাকার পর চলতি বছরের ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশিদের জন্য আবার পর্যটন ভিসা দেওয়া শুরু করেছে ভারত।

এ ছাড়া ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার বিষয়টি সামনে রেখে দ্রুত ঢাকা-নয়াদিল্লি আলোচনা শুরু করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। নতুন পানিসম্পদ-সংক্রান্ত তথ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্য-পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে চুক্তি নবায়নের প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার বিষয়টিকে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে অব্যাহত রাখার সুপারিশও করা হয়েছে।

কূটনৈতিক বার্তার তাৎপর্য

সামগ্রিকভাবে ভারতের সংসদীয় কমিটির সামনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত অবস্থান থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে-প্রথমত, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান মানবিক বিবেচনায়; দ্বিতীয়ত, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবেন না; এবং তৃতীয়ত, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ আবেদন ভারতীয় আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ভারতের সর্বশেষ অবস্থান একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে-আশ্রয় দেওয়া আর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া এক বিষয় নয়। অর্থাৎ শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করতে পারলেও সেখান থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ নেই। একই সময়ে প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না জানিয়ে বিষয়টিকে আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যেই রেখেছে। ফলে এখন নজর থাকবে দিল্লির আইনি সিদ্ধান্ত এবং ঢাকা-দিল্লির পরবর্তী কূটনৈতিক যোগাযোগের দিকে।

ভারতের এই অবস্থান শুধু শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ অবস্থান নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আগামী কূটনৈতিক গতিপথেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। মানবিক আশ্রয় বহাল রেখে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা এবং প্রত্যর্পণ প্রশ্নে আইনগত অবস্থান-এই তিনটি বিষয়ই এখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

ফিরে দেখা

টানা প্রায় দেড় দশক অবৈধ পন্থায় বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্ব দেন শেখ হাসিনা। এ সময় তার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দল, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, সাংবাদিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বারবার গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা, নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন এবং দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়।

দীর্ঘ সময় ধরে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ। বিশেষ করে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়। সরকারের দমন-পীড়ন ও হত্যা-নির্যাতনের কারণে আন্দোলন দ্রুত সহিংস রূপ নেয় এবং আন্দোলন সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগ, প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। শেষ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-জনতা হত্যার মধ্য দিয়েও এই আন্দোলনকে দমন করতে পারেনি ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার সরকার। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান তিনি।

পরবর্তীতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত ও প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ, নির্বিচার গুলি, অবৈধ আটক, নির্যাতন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির সুপারিশ করা হয়।

গণআন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেন এবং ভারতে যান। এরপর দেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের আবেদন করে, যা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী বর্তমানে তাদের আইন ও বিধি অনুযায়ী পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)