তসলিম শিমুল
, যশোর
বিশ্বকাপ মানেই ফুটবলের সৌন্দর্য, আবেগ আর রোমাঞ্চের এক মহামঞ্চ। কিন্তু এই মহারণের আরেকটি পরিচয়ও আছে- উত্তেজনা, সংঘর্ষ এবং রেফারির পকেট থেকে বেরিয়ে আসা কার্ড। ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই যখন তিনটি লাল কার্ড দেখাতে হলো, তখন স্বাভাবিকভাবেই ফুটবলপ্রেমীদের মনে ফিরে এসেছে ২০০৬ সালের সেই কুখ্যাত ‘কার্ড বিশ্বকাপ’-এর স্মৃতি।
মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে জয় দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করে স্বাগতিকরা। তবে ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শুধু ফল নয়, বরং রেফারি উইলটন পেরেরার কঠোর সিদ্ধান্তগুলো।
ম্যাচের ৪৯তম মিনিটে প্রথম লাল কার্ড দেখেন দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার ইয়াইয়া সিটহোলে। প্রতিপক্ষের একটি আক্রমণ থামাতে গিয়ে তিনি বক্সের সামনে বিপজ্জনক ট্যাকেল করেন। ঘটনাটি দেখে রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ফলে দশ জনের দলে পরিণত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা।
এরপর ম্যাচের ৮২তম মিনিটে আরও বড় বিপদে পড়ে আফ্রিকান প্রতিনিধিরা। প্রতিপক্ষের ফুটবলারের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও অসদাচরণের ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন তেম্বা জওয়ানে। প্রথমে রেফারি তাকে হলুদ কার্ড দেখালেও ভিএআর পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত বদলে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ফলে শেষ মুহূর্তে নয় জন নিয়ে খেলতে বাধ্য হয় দক্ষিণ আফ্রিকা।
তৃতীয় লাল কার্ডটি আসে ম্যাচের শেষ দিকে। মেক্সিকোর ডিফেন্ডার সিজার মন্টেস প্রতিপক্ষের একটি সম্ভাবনাময় আক্রমণ রুখতে গিয়ে বক্সের সামনে ফাউল করেন। রেফারি সেটিকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ফলে জয় পেলেও ম্যাচ শেষ করতে পারেনি স্বাগতিক দল পূর্ণ শক্তিতে।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে তিনটি লাল কার্ডের এই ঘটনা অনেককেই মনে করিয়ে দিয়েছে ২০০৬ বিশ্বকাপের কথা। জার্মানিতে অনুষ্ঠিত সেই আসরে পুরো টুর্নামেন্টে দেখানো হয়েছিল ৩৪৫টি হলুদ ও ২৮টি লাল কার্ড। আর তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল পর্তুগাল-নেদারল্যান্ডসের ‘ব্যাটেল অব নুরেমবার্গ’ ম্যাচ, যেখানে দেখানো হয়েছিল ১৬টি হলুদ ও চারটি লাল কার্ড।
সেই ম্যাচে কঠিন ট্যাকলের শিকার হয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়েন সেই সময়ের তরুণ ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। ম্যাচজুড়ে সংঘর্ষ, উত্তেজনা ও কার্ডের বন্যা এতোটাই ছিল যে সেটি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ম্যাচগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই তিনটি লাল কার্ড দেখিয়ে রেফারিরা যেন স্পষ্ট বার্তা দিলেন- খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। তবে এটিও সত্য, উদ্বোধনী ম্যাচের এই কার্ডঝড় বিশ্বকাপপ্রেমীদের মনে ২০০৬ সালের সেই উত্তপ্ত আসরের স্মৃতিকে আবারও জীবন্ত করে তুলেছে।
এখন দেখার বিষয়, বিশ্বকাপ যত এগোবে, কার্ডের সংখ্যা কি বাড়তে থাকবে, নাকি উদ্বোধনী ম্যাচের এই ঘটনাই শেষ পর্যন্ত ব্যতিক্রম হিসেবেই থেকে যাবে। তবে শুরুটা যে ২০০৬ সালের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।