যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈরিতা
তসলিম শিমুল
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ম্যাচ। রাজনৈতিক বৈরিতার দীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও ম্যাচ শুরুর আগে ইরানের ফুটবলাররা মার্কিন খেলোয়াড়দের হাতে সাদা গোলাপ তুলে দেন। দুই দলের খেলোয়াড়রা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছবি তোলেন, যা ফুটবল ইতিহাসে শান্তি ও সৌহার্দ্যের এক অনন্য প্রতীক হয়ে আছে।
কিন্তু প্রায় তিন দশক পর ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং কূটনৈতিক টানাপড়েনের প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে ফুটবলের ওপরও।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ইরান দলের খেলোয়াড়দের ভিসা নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ফুটবলাররা ভিসা পেলেও দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মীকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে দল পরিচালনা ও প্রস্তুতিতে নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে।
নিরাপত্তাজনিত কারণেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে ইরানের পরিকল্পনায়। যুক্তরাষ্ট্রে নির্ধারিত বেস ক্যাম্প পরিবর্তন করে দলকে মেক্সিকোতে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানি সমর্থকদের জন্য বরাদ্দ টিকিট নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইরানের ফুটবল ফেডারেশন অভিযোগ করেছে, তাদের সমর্থকদের জন্য নির্ধারিত টিকিটের একটি অংশ বাতিল বা সীমিত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ন্যায্যতার প্রশ্ন তুলেছে।
এ পরিস্থিতিতে ফিফাও চাপে পড়েছে। খেলাধুলাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার নীতির কথা বারবার বলা হলেও বাস্তবে বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে ভূরাজনীতির প্রভাব এড়ানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
তবে মাঠের লড়াইয়ে ইরানকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। গত দুই দশকে দেশটির ফুটবল উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ লিগে খেলা অভিজ্ঞ ফুটবলারদের নিয়ে গড়া বর্তমান দলটি এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী প্রতিনিধিদের একটি।
১৯৯৮ সালে গোলাপ হাতে যে ইরান বিশ্বকে বন্ধুত্বের বার্তা দিয়েছিল, ২০২৬ সালে সেই দেশই বিশ্বকাপে নামছে যুদ্ধসহ নানা বৈরী পরিস্থিতিতে। ইতিমধ্যে দলটি ‘হ্যাশট্যাগ ১৬৮’ সিম্বল ব্যবহার করে আলোচনায় এসেছে। এই সিম্বলের মাধ্যমে তারা ইরানের ওপর আগ্রাসী যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার প্রথম দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো বোমা হামলায় বালিকা বিদ্যালয়ের ১৬৮ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুকে বুঝিয়েছে।
এখন ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ফুটবল কি আবারও রাজনীতির দেয়াল ভেঙে ঐক্যের বার্তা দিতে পারবে, নাকি মাঠের বাইরের সংঘাতই ছাপ ফেলবে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসরে?
লেখক: ক্রীড়ালেখক