যবিপ্রবি প্রতিনিধি
অভিযুক্ত হুমকিদাতা ইজাজুল কবীর
ছবি: সুবর্ণভূমি
ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা দেখাকে কেন্দ্র করে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস (এআইএস) বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সাইফুল্লাহকে মারধর এবং ঘটনার ভিডিও করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হেনস্তার অভিযোগের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তা প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে বিচার না হওয়ায় অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সাংবাদিকদের উদ্দেশে আপত্তিকর মন্তব্য এবং প্রকাশ্যে মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। এতে ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সাংবাদিকরা।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাত ২টার দিকে এআইএস বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সাইফুল্লাহকে মারধরের ঘটনায় অভিযুক্ত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইজাজুল কবীর সাংবাদিকদের দেওয়া একটি পোস্ট নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেন। ওই পোস্টে মন্তব্য করে তিনি লেখেন, ‘সবাই ভুলে গেলেও আমি ভুলতে পারছি না...। এই ফাত্রামির হিসাব সাংঘাতিক সমিতিকে দিতে হবে...। এখন আসলেই আফসোস হয়, মারলেই ভালো হতো...।’
ওই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে গত ৭ জুলাই বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলা দেখাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক হেনস্তা এবং এআইএস বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ইঞ্জি. ইমরান খানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তদন্ত কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন প্রশাসনের কাছে জমা দেয়। এরই মধ্যে রিজেন্ট বোর্ডের সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদনের ফলাফল বা সুপারিশ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
মারধরের শিকার এআইএস বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মো. সাইফুল্লাহ বলেন, গত ৭ জুলাই আমি নির্মম হামলার শিকার হই। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন প্রক্টর স্যার এবং ঘটনার ভিডিও প্রমাণও রয়েছে। প্রশাসনের প্রতি আস্থা রেখে আমরা সেদিন কোনো পাল্টা সংঘর্ষে জড়াইনি। পরবর্তীতে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও আজ দুই মাস অতিবাহিত হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আমি প্রতিশোধ চাই না, চাই নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার। প্রশাসনের এভাবে নীরব থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রশাসন ব্যর্থ হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো উচিত।
ঘটনার সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ভিডিও করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হন দৈনিক জনকণ্ঠের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ইমরান হোসেন, চ্যানেল আইয়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মাহফুজুল ইসলাম ও দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি সাব্বির আহমেদ।
দৈনিক জনকণ্ঠের প্রতিনিধি ইমরান হোসেন বলেন, নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহের জন্য আমরা সেদিন ভিডিও করতে শুরু করি। ভিডিও করলে তথ্য-প্রমাণ থাকে। এ কারণে তারা আমাদের ফোন ফেলে দেন এবং আমার বুকে ধাক্কা দেন। আমরা পরদিনই প্রশাসনের কাছে বিচার চেয়ে আবেদন দিলেও এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে সাংবাদিকদের প্রকাশ্যে মারধরের হুমকি দিচ্ছেন। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।
ফেসবুকে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠা পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইজাজুল কবীর বলেন, আমার ফেসবুক পোস্টের কারণে কি সবাই ভয় পেয়ে গেছে? সবার কি হাত-পা কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেছে আমার পোস্ট আর কমেন্ট দেখে? ফেসবুকে কত মানুষ কত কিছুই তো করে। তোমরা তোমাদের প্রমাণ যা আছে, তা প্রক্টরের কাছে দাও। পরে আমি দেখতেছি যে কী করা লাগে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের মারামারির ঘটনার যে তদন্ত কমিটি হয়েছিল, সেটার বিচারই তো প্রক্টর এখনো করেনি। আমার যা ইচ্ছা, আমি তাই পোস্ট করব। তুই আমাকে জিজ্ঞাসা করার কে? তুই কোন বিভাগের শিক্ষার্থী আর তুই কোন হলে, কত নম্বর কক্ষে থাকিস, সেটা বল।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ইঞ্জি. ইমরান খান বলেন, আমরা তদন্ত কমিটির নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছি। এরপর কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তা প্রশাসনই ভালো বলতে পারবে। এ বিষয়ে আমি অবগত নই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. হামিদুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যথেষ্ট কনসার্ন। এ বিষয়ে উচ্চতর কমিটি গঠন করা হবে। এ ধরনের ঘটনা যেন দ্বিতীয়বার না ঘটে, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। উচ্চতর কমিটির ফলাফলের ভিত্তিতে রিজেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
এ বিষয়ে যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বলেন, সাংবাদিকরা সবসময় সত্য তুলে ধরেন। এ কারণে মাঝে মধ্যে তাদের হুমকির মুখে পড়তে হয়। কেউ বাড়াবাড়ি করলে আপনারা আইনি ব্যবস্থা নেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা আগামী ২৯ তারিখে একটি রিজেন্ট বোর্ড সভা করব। ওই সভায় খুব দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।