পার্থিব আহসান
‘বৃদ্ধাশ্রম’ এমন একটি শব্দ, যার সাথে জড়িয়ে আছে কান্না, গভীর বিষাদ আর সীমাহীন নিঃসঙ্গতার গল্প। শৈশব থেকে শুরু করে যৌবন পর্যন্ত নিজের সবটুকু নিঃশেষ করে যে বাবা-মা সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে তোলার চেষ্টা করেন, জীবনের শেষ বিকেলে তারাই হয়ে পড়েন সবচেয়ে অবহেলিত ও অপ্রয়োজনীয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সন্তানদের সান্নিধ্য কামনাও তাদের কাছে এক অনুচ্চারিত অপরাধে পরিণত হয়।
বৃদ্ধাশ্রম আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত না হলেও দিন দিন এর সংখ্যা বাড়ছে। আধুনিকতার অজুহাতে কিংবা পারিবারিক দায়বদ্ধতা এড়ানোর প্রবণতায় অনেক সন্তানই জন্মদাতাদের ঠেলে দিচ্ছেন এই নিঃসঙ্গ ঠিকানায়।
শিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তীর বিখ্যাত গান ‘বৃদ্ধাশ্রম’ কেবল সুর আর কথার সংমিশ্রণে রচিত কোনো সাধারণ গান না। এটি সমাজের এক চরম ও নিষ্ঠুর সত্যের বাস্তবতা। তিনি গানের প্রতিটি চরণে এক মায়ের অসহায়ত্ব, সন্তানের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা এবং শেষ বয়সে অবহেলা ও বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়কে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। গানটি শোনার পর প্রতিটি সন্তানের মনে গভীর অনুশোচনার সৃষ্টি হয়।
সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য মা-বাবা নিজেদের জীবনপাত করেন। যে মা গর্ভে ধারণ করে আমাদের আলোর মুখ দেখিয়েছেন তার ঋণের বোঝা কোনোভাবেই শোধ করা যায় না। তার সঙ্গে রয়েছে আমাদের বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত মেনে নেওয়া সমস্ত আবদার। একটু অসুখ হলেই নিজে না ঘুমিয়ে আমাদের জন্য রাত জেগে সেবা করেছেন, সবকিছু পরিপাটি করে সাজিয়েছেন, সন্তান না খাওয়া পর্যন্ত অভুক্ত থেকেছেন। আরও অনেক কথা—যা কখনো লিখে শেষ করা যায় না।
প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে শৈশব-কৈশোর পার করে মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়ায়, নতুন সংসার গড়ে তোলে। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে মা-বাবার যখন শারীরিক ও মানসিক শক্তি কমে আসে। তখন সন্তানই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র আশ্রয়।
অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি, অনেক সন্তান নিজের সংসার গুছিয়ে নেওয়ার পর মা-বাবার অতীতের সকল ত্যাগ ও ভালোবাসার কথা ভুলে যায়। বসতবাড়িতে পোষ্য প্রাণীর জায়গা হলেও মা-বাবার একটু স্থান মেলে না। পরিশেষে তাদের জায়গা হয় বৃদ্ধাশ্রমে।
এমন ঘটনা হয়তো আমাদের সমাজে অহরহ ঘটে না, তবে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে না পাঠিয়ে ঘরের এক কোণে অবহেলায় ফেলে রাখার দৃশ্য হরহামেশা দেখা যায়। ভালোবাসা ও সম্মানহীন এমন জীবন বৃদ্ধাশ্রমের নির্মমতার চেয়ে কোনো অংশে কম কষ্টের নয়।
পারিবারিক সম্পর্কের অবক্ষয় কতটা নিষ্ঠুর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, তার এক জলজ্যান্ত প্রমাণ মিলেছিল কিছুদিন আগে ঢাকায়। মিরপুরের এক অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে নূরজাহান বেগম (৭৫) নামে এক বৃদ্ধার পচা-গলা মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মৃত্যুর বেশ কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও পরিবারের কেউ তার খবর রাখেনি।
পুলিশ ও প্রতিবেশীদের সূত্রে গণমাধ্যমে খবর আসে, চার সন্তানের জননী এই বৃদ্ধার বড় ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব, মেজো ছেলে বুয়েটের শিক্ষক, ছোট ছেলে কানাডাপ্রবাসী এবং মেয়ে পেশায় শিক্ষক। সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হলেও মায়ের বিষয়ে উদাসীন ছিলেন। শেষ পর্যন্ত এক নার্সের তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করা হলে পুলিশ গিয়ে তার মরদেহ উদ্ধার করে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং আমাদের সামাজিকভাবে ক্ষয়ে যাওয়া নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
প্রবীণ নিবাস বা বৃদ্ধাশ্রমের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে, খ্রিস্টপূর্ব ২২ শতকে চীনের শান রাজবংশের আমলে এর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। সে সময় গৃহহীন, পরিবারচ্যুত ও অসহায় প্রবীণদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। সমাজের মূলধারার বাইরে চলে যাওয়া বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের নিরাপদ ছাদ দেওয়ার সেই মানবিক প্রয়াসটিই কালক্রমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। রাজতন্ত্রের যুগে নেওয়া সেই সামাজিক পদক্ষেপই আজকের আধুনিক বৃদ্ধাশ্রমের রূপ ধারণ করেছে।
বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রম ও প্রবীণ কল্যাণের ধারণা প্রবর্তিত হয় ডা. এ কে এম আবদুল ওয়াহেদের হাত ধরে। ১৯৬০ সালে তার উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ প্রবীণহিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৩-৯৪ সালে সরকারি অনুদানে আগারগাঁওয়ে হাসপাতাল ও প্রবীণ নিবাস ভবন নির্মিত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ৫০টিরও বেশি শাখা রয়েছে। প্রবীণদের নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বেশ কিছু সংস্থা কাজ করলেও তা মূলত সহায়-সম্বলহীনদের চিকিৎসাসেবা ও সাময়িক আশ্রয় দেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির ফলে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে প্রবীণদের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ১৯৯০ সালে যেখানে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠী ছিল মাত্র ৪০ লাখ ৯০ হাজারের মতো, সেখানে ২০২৫-২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী তা প্রায় এক কোটি ৮০ লাখে পৌঁছেছে।
বর্তমান যুগে ‘জেনারেশন গ্যাপ’ বা প্রজন্মগত ব্যবধান ও পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ আমাদের সুদৃঢ় পারিবারিক মূল্যবোধকে শিথিল করে দিচ্ছে। উচ্চশিক্ষা ও উন্নত জীবনের টানে সন্তানেরা পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে বা শহুরে জীবনে। মাস শেষে মা-বাবার কাছে অর্থ পাঠানো হলেও জীবনের শেষ বিকেলেই সেই বয়োবৃদ্ধ মানুষদের পাশে বসে দুটো কথা বলার বা একটু খোঁজ নেওয়ার কেউ থাকছে না। অথচ বস্তুগত সুবিধা কিংবা মাসের আর্থিক সহায়তা কখনোই সন্তানের শারীরিক উপস্থিতি, আন্তরিক স্নেহ আর অনুভূতির বিকল্প হতে পারে না। ফলে প্রবীণদের সংখ্যা বাড়লেও তাদের জীবনের শেষ দিনগুলো ঢেকে যাচ্ছে এক নিদারুণ নিঃসঙ্গতায়।
একক পরিবারের আধিক্য, নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং সম্পর্কের চেয়ে বস্তুগত সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতাই প্রবীণদের পরিবারে বোঝা বানিয়ে তুলছে। অথচ বাংলাদেশে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন-২০১৩’ প্রণীত হলেও এর যথাযথ প্রয়োগ ও সামাজিক সচেতনতার অভাবে প্রবীণরা এখনও নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শৈশব থেকেই সন্তানদের মধ্যে মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রবীণদের অবহেলা না করে তাদের প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতাকে পরিবারের কল্যাণে কাজে লাগানো জরুরি।
আজকের নবীন সময়ের অবধারিত নিয়মে আগামী দিনের প্রবীণ। যে সন্তান আজ মা-বাবার সাথে অমানবিক আচরণ করছে, কাল তার নিজের সন্তানও হয়তো একই নির্মমতার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। বৃদ্ধাশ্রম কোনো সমস্যার সমাধান নয়। এটি সমাজের মানবিক পরাজয়ের দলিল।
ইট-পাথরের যান্ত্রিক শহর কিংবা বহুতল ভবনের বিলাসী জীবনের চেয়েও বড় সত্য হলো রক্তের টান আর অনুভূতির বন্ধন। বৃদ্ধাশ্রম নয়, শ্রদ্ধাবোধ, নৈতিক শিক্ষা ও সুদৃঢ় পারিবারিক মূল্যবোধের মাধ্যমে প্রতিটি ঘরই হয়ে উঠুক মা-বাবার শেষ বয়সের সবচেয়ে নিরাপদ ও আনন্দময় স্বর্গরাজ্য। মিহি সুতোয় বাঁধা আমাদের পারিবারিক ভালোবাসা আর মায়াজাল কোনো আধুনিকতার প্রভাবেই যেন ছিড়ে না যায়।
লেখক: সরকারি মাইকেল মধূসুদন কলেজে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী