যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ওয়ারিশের হক আত্মসাতের ভয়াবহ পরিণতি

মুফতি আরিফুল ইসলাম ফয়সাল

প্রকাশ : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর,২০২৬, ১১:০০ এ এম
ওয়ারিশের হক আত্মসাতের ভয়াবহ পরিণতি

পিতা ইন্তেকাল করেছেন। রেখে গেছেন বসতভিটা, কৃষিজমি, পুকুর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা সঞ্চিত অর্থ। পিতৃশোকের পরিবেশ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলেও অনেক পরিবারে শুরু হয় সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ। বড় ভাই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখেন। ছোট ভাইয়েরা প্রাপ্য চাইলে বলা হয়, ‘আমি বড়, আমিই সব বুঝি।’ বোনেরা অধিকার চাইলে শুনতে হয়, ‘তোমার তো বিয়ে হয়ে গেছে, আবার বাবার সম্পত্তি কেন?’ কখনো সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি, কখনো সামাজিক অপমান, আবার কখনো বছরের পর বছর বণ্টনের নামে কালক্ষেপণ চলে।

বাংলাদেশের গ্রাম ও শহর—উভয় জায়গায় এমন ঘটনা পারিবারিক সম্পর্ককে বিষিয়ে তুলছে। অথচ ইসলাম উত্তরাধিকারকে মানুষের খেয়ালখুশির ওপর ছেড়ে দেয়নি। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক যোগ্য ওয়ারিশের অধিকার নির্ধারণ করেছেন। সেই অধিকার আত্মসাৎ করে কেউ প্রকৃত অর্থে সফল হতে পারে না।

উত্তরাধিকার আল্লাহর নির্ধারিত বিধান

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজন যা রেখে যায়, তাতে পুরুষদের অংশ রয়েছে এবং নারীদেরও অংশ রয়েছে।’ সুরা আন-নিসা, ৪:৭

এই আয়াত নারী-পুরুষের উত্তরাধিকারের মৌলিক ভিত্তি স্পষ্ট করে। বোন বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত, ধনী কিংবা দরিদ্র—এসব কারণে তার উত্তরাধিকার বাতিল হয় না। বিয়েতে খরচ করা, উপহার দেওয়া কিংবা সামাজিক সহযোগিতা করা উত্তরাধিকারের বিকল্প নয়; তবে জীবদ্দশায় বৈধভাবে সম্পদ হস্তান্তর হয়ে থাকলে তার বিধান পৃথকভাবে বিবেচিত হবে। একইভাবে বড় ভাই হওয়া ছোট ভাইয়ের সম্পত্তি দখলের অধিকার দেয় না। পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া সম্মানের বিষয়, কিন্তু তা অন্যের সম্পদের মালিকানা অর্জনের উপায় নয়।

বড় ভাইয়ের দায়িত্ব, ছোটদের হক

পিতা-মাতার মৃত্যুর পর বড় ভাই অনেক সময় পরিবারের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন। ছোটদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বিয়ে কিংবা পারিবারিক সমস্যা সমাধানে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু এই দায়িত্বের আড়ালে যদি তিনি ছোটদের প্রাপ্য আটকে রাখেন, জমির আয় গোপন করেন কিংবা তাদের সম্মতি ছাড়া সম্পত্তি নিজের মতো ব্যবহার করেন, তাহলে দায়িত্ব আমানতদারির বদলে জুলুমে পরিণত হয়।

ইসলামে উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয় শরিয়তের বিধান অনুযায়ী। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পায় ছেলে; কিন্তু এর অর্থ বড় ছেলে ছোট ছেলে বা মেয়ের অংশ থেকে অতিরিক্ত কিছু নিতে পারবেন—এমন নয়। একই স্তরের ছেলেসন্তানদের ক্ষেত্রে সাধারণত অংশ সমান হয়। তবে মৃত ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী, বাবা-মা এবং অন্যান্য ওয়ারিশের উপস্থিতিতে হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।

বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছোট ভাই-বোনের সম্পদ যার তত্ত্বাবধানে থাকে, তার দায়িত্ব আরও গুরুতর। তাদের সম্পদ রক্ষা করা কর্তব্য; নিজের সম্পদ মনে করে ভোগ করা নয়।

বোনের সম্পদ আত্মসাৎ: কুরআনের কঠোর সতর্কতা

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।’ সুরা আল-বাকারা, ২:১৮৮

বোনের প্রাপ্য আটকে রাখা, জমির তথ্য গোপন করা, জাল দলিল তৈরি করা কিংবা ভয় দেখিয়ে অধিকার ত্যাগের কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া—এসব অন্যায় পন্থা থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য। বোনকে ‘লোভী’ আখ্যা দিয়ে তার অধিকার দাবিকে অপমান করা ন্যায়বিচার নয়। আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে এতিমদের সম্পদ আত্মসাতের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের সম্পদ ভক্ষণ করে, তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভক্ষণ করে এবং অচিরেই তারা প্রজ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে।’ সুরা আন-নিসা, ৪:১০

এই আয়াত বিশেষভাবে এতিমদের সম্পদ আত্মসাতের ব্যাপারে নাজিল হওয়া কঠোর সতর্কবার্তা। তাই অপ্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশের সম্পদ তত্ত্বাবধানকারীদের জন্য এটি বিশেষ শিক্ষা। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক ভাই-বোনের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করাও গুরুতর জুলুম।

মৃত ভাইয়ের স্ত্রী-সন্তানের সম্পত্তির অধিকার আত্মসাৎ ভয়াবহ জুলুম

আমাদের সমাজে কখনো দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী ও সন্তানদের পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করেন মৃত ব্যক্তির বড় ভাই-বোনেরা কিংবা শ্বশুর-শাশুড়ি। কখনো বলা হয়, ‘ছেলে নেই, তাই সম্পত্তি আমাদের’; কখনো বিধবা নারীকে অসহায় পেয়ে তার সন্তানদের প্রাপ্য আটকে রাখা হয়। অথচ কারও মৃত্যু তার স্ত্রী-সন্তানের বৈধ উত্তরাধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ নয়।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজন যা রেখে যায়, তাতে পুরুষদের অংশ রয়েছে এবং নারীদেরও অংশ রয়েছে।’ সুরা আন-নিসা, ৪:৭

মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ও সন্তান থাকলে তারা শরিয়তের বিধান অনুযায়ী উত্তরাধিকারী হন। তার বোনেরাও কোনো কোনো পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকারী হতে পারেন; কিন্তু তাদের অংশ নির্ভর করে অন্যান্য ওয়ারিশের উপস্থিতি ও প্রযোজ্য বিধানের ওপর। তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব সম্পত্তির মালিক হয়ে যান না। একইভাবে শ্বশুর-শাশুড়িও শুধু সম্পর্কের কারণে পুত্রবধূর নিজস্ব সম্পত্তি কিংবা মৃত ছেলের সম্পত্তির মালিক হয়ে যান না; তবে মৃত ব্যক্তির বাবা-মা জীবিত থাকলে তারা শরিয়ত অনুযায়ী উত্তরাধিকার পেতে পারেন।

অতএব, বিধবা নারী ও এতিম সন্তানদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের প্রাপ্য আটকে রাখা গুরুতর জুলুম। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো; কেননা জুলুম কিয়ামতের দিন বহু অন্ধকারের কারণ হবে।’ সহিহ মুসলিম, ২৫৭৮

মনে রাখবেন, বিধবা ও এতিমদের হক মেরে কেউ সম্মানিত অভিভাবক হতে পারে না। আত্মীয়তার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে তাদের অধিকারও রক্ষা করতে হবে।

ওয়ারিশকে হুমকি দেওয়া ও আখিরাতের পরিণতি

কেউ নিজের প্রাপ্য চাইলে তাকে বাড়িতে আসতে নিষেধ করা, সম্পর্ক ছিন্ন করার ভয় দেখানো কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে অপমান করা সমস্যার সমাধান নয়। বরং এতে সম্পত্তির অন্যায়ের সঙ্গে মানসিক নির্যাতনও যুক্ত হয়।

যে বড় ভাই মনে করেন, ছোটরা দুর্বল বলে কিছু করতে পারবেন না, কিংবা বোনেরা সামাজিক লজ্জায় চুপ থাকবেন, তার মনে রাখা উচিত, মানুষের নীরবতা অন্যায়কে বৈধ করে না। দুনিয়ায় প্রভাব খাটানো সম্ভব হলেও আল্লাহর বিচার এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

সম্পত্তির বিরোধ শুধু জমিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে পারিবারিক সম্পর্ক, সন্তানদের মানসিকতা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জীবনেও। যে সম্পদ পরিবারের কল্যাণের মাধ্যম হওয়ার কথা, সেটিই হয়ে ওঠে বিচ্ছেদের কারণ।

কখন উত্তরাধিকার বণ্টন করতে হবে

মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের আগে প্রয়োজনীয় দাফন-কাফনের ব্যয়, প্রমাণিত ঋণ এবং শরিয়তসম্মত ওসিয়ত, প্রযোজ্য শর্ত ও সীমা অনুযায়ী, নিষ্পত্তি করতে হবে। এরপর অবশিষ্ট সম্পত্তি বৈধ ওয়ারিশদের মধ্যে শরিয়তের বিধান অনুসারে বণ্টন করা উচিত।

ওয়ারিশ নির্ধারণ, দলিল সংগ্রহ কিংবা আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে যুক্তিসংগত সময় লাগতে পারে। কিন্তু কোনো বাস্তব কারণ ছাড়া বছরের পর বছর সম্পত্তি আটকে রেখে একজনের একক ভোগদখল চালিয়ে যাওয়া অন্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে।

কোনো ওয়ারিশ নিজের অংশ অন্যকে দিতে চাইলে তা হতে হবে নিজের অধিকার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর, স্বাধীন সম্মতিতে এবং কোনো ভয়ভীতি বা প্রতারণা ছাড়া।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় করণীয়

প্রথমত, মৃত ব্যক্তির জমিজমা, বাড়িঘর, ব্যবসা, ব্যাংক হিসাব, পাওনা ও ঋণের তালিকা প্রস্তুত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সব বৈধ ওয়ারিশ শনাক্ত করে তাদের প্রাপ্য নির্ধারণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, অভিজ্ঞ আলেম, উত্তরাধিকার বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীর সহায়তায় শরিয়তসম্মত হিসাব এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

জমির ক্ষেত্রে দলিল, খতিয়ান, ওয়ারিশ সনদ এবং প্রযোজ্য বণ্টননামা ও নামজারি-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। শুধু ওয়ারিশ সনদ থাকলেই সম্পত্তির সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ হয় না। বিরোধ মীমাংসায় স্থানীয় আলেম, জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ন্যায়সঙ্গত মধ্যস্থতা করতে পারেন। তবে সালিশের নামে কোনো ওয়ারিশকে অধিকার ছাড়তে চাপ দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন হলে আইনসম্মত প্রতিকার নিতে হবে; আর্থিক অসচ্ছল ব্যক্তিরা সরকারি আইনগত সহায়তার সুযোগ সম্পর্কেও খোঁজ নিতে পারেন।

যারা ইতিমধ্যে ছোট ভাই-বোনের সম্পত্তি আটকে রেখেছেন, তাদের উচিত দেরি না করে হিসাব পরিষ্কার করা, প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া এবং অন্যায় আচরণের জন্য ক্ষমা চাওয়া। শুধু মুখে তওবা নয়, মানুষের হক ফিরিয়ে দেওয়াও জরুরি।

বড় ভাইয়ের প্রকৃত মর্যাদা ছোটদের সম্পদ দখলে নয়, তাদের অধিকার রক্ষায়। বোনের উত্তরাধিকার তার প্রতি ভাইয়ের অনুগ্রহ নয়; এটি আল্লাহর নির্ধারিত অধিকার। সম্পত্তির লোভে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা কোনোভাবেই ইসলামের শিক্ষা হতে পারে না।

আসুন, এমন পরিবার গড়ে তুলি, যেখানে বোনকে নিজের হক চাইতে ভয় পেতে হবে না, ছোট ভাইকে বড় ভাইয়ের প্রভাবের কাছে অসহায় হতে হবে না; বরং প্রত্যেকে ন্যায়সঙ্গতভাবে নিজের প্রাপ্য বুঝে পাবেন। দুনিয়ার সম্পদের চেয়ে মানুষের হক আদায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: ইমাম ও খতিব, নলডাঙ্গা রোড জামে মসজিদ, যশোর

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)