বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
যশোরের বেনাপোল সীমান্তে বিজিবি-জনতা ঐক্য আর দেশপ্রেম, সাহসিকতা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বিএসএফ-কে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং স্থানীয় মানুষ এমনটিই বলছেন।
গত ৩১ মে দিনগত রাতে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার গেট খুলে ৮-১০ ব্যক্তিকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের দিকে ঠেলে দেয়, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিলেন। বিজিবির কাছে খবর ছিল, অন্তত তিনটি গাড়িতে করে বিএসএফ বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্তের ওপারে ১০০ থেকে ১২০ জন তথাকথিত বাংলাদেশিকে জড়ো করেছে, যাদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হবে। সেই খবরের প্রেক্ষিতে বিজিবি প্রস্তুত ছিল এবং উল্লিখিত ৮-১০ জনের দলটিকে ঠেকিয়ে দেয়। বাধ্য হয়ে তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নীচে অবস্থান করতে থাকেন।
ভূখণ্ডগতভাবে বাংলাদেশের চেয়ে ভারত অনেক বড়, সামরিক শক্তিতেও তারা অনেক এগিয়ে। তাহলে কীভাবে বিএসএফের এই তৎপরতা রুখে দেওয়া গেল?Ñ এমন প্রশ্নে বিজিবি যশোর ৪৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম খান বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সীমান্তে বিজিবি বা বিডিআরের সঙ্গে বিএসএফের খণ্ডযুদ্ধের উদাহরণ দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তাদের কি কোনো জয়ের ইতিহাস আছে? পদুয়া, রৌমারি, বড়ইবাড়িসহ কোথাও কি বিজিবি বা বিডিআর হেরেছে? তাহলে শুধু বড় দেশ বা বিশাল বাহিনী থাকলেই হয় না। কাজটা আপনি বৈধ করছেন নাকি আপনার সরকার চেয়েছে তাই করতে বাধ্য হচ্ছেন, এর ওপর নির্ভর করে আপনার মনোবল, সাহসিকতা।’
বিজিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘দেখুন, পৃথিবীর সমস্ত দেশের প্রতিবেশি ও সীমান্ত আছে। কিন্তু কোথাও এভাবে লোকজনকে ঠেলে অন্য দেশে পাঠানোর নজির নেই। বিএসএফ যাদেরকে জোর করে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তারা আদৌ বাংলাদেশি কি না, সেই প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। যদি তারা সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকেন এবং কোনো কারণে ভারতে আটকা পড়েন, তো তাদের এদেশে ফেরত পাঠানোর কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ভারত সেটি করতে পারে। যাচাই-বাছাইয়ে যদি প্রমাণিত হয় যে, ওই লোকেরা বাংলাদেশি, তো তাদেরকে যেকোনো ইন্টারন্যাশনাল চেকপোস্ট (আইসিপি) দিয়ে আইনগতভাবে ফেরত পাঠানো সম্ভব। কিন্তু বিএসএফ সেটা না করে রাতের আঁধারে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে। এখানে আইনগতভাবে আমাদের অবস্থান পুরোপুরি বৈধ, বিএসএফের অবস্থান অবৈধ। সেই কারণে আমাদের মনোবল অনেক বেশি ছিল।’
‘তাছাড়া সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের মানুষের দেশপ্রেম অসাধারণ। তারা বিজিবির সাথে যুক্ত হয়ে তথাকথিত পুশইনের চেষ্টা রুখে দিতে অনন্য ভূমিকা রেখেছে,’ বলেন এই বিজিবি কর্মকর্তা।
যশোর এলাকায় বিজিবির একটি থেকে আরেকটি আউটপোস্টের গড় দূরত্ব ৫/৬ কিলোমিটার। একেক আউটপোস্টে সামান্য কিছু জনবল থাকে। তাদের পক্ষে বিএসএফের সংঘবদ্ধ আগ্রাসী তৎপরতা রুখে দেওয়া জনগণের সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয়।
এই প্রসঙ্গে বেনাপোলের যে সাদিপুরের মাঠ দিয়ে বিএসএফ লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে, সেই গ্রামের বাসিন্দা রাকিব আহমেদ বলেন, ‘১ জুন সকালে আমরা জানতে পারি বিএসএফ কিছু লোককে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা বিজিবি প্রতিহত করেছে। এরপর আমরা গ্রামবাসী একযোগে বিজিবির পাশে এসে দাঁড়াই। সামান্য কয়েকজন বিজিবি সদস্যের সঙ্গে আমরা বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সীমান্ত পাহারা দিতে থাকি। এরপর মিডিয়া ও রাজনৈতিক নেতাদের আনাগোনায় বিএসএফ বুঝে ফেলে তাদের চেষ্টা ব্যর্থ। সেই কারণে তারা দুই দিন পর রাতের আঁধারে সেই লোকগুলোকে শূন্যরেখা থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। নতুন করে কাউকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টাও করেনি।’
বিজিবি কর্মকর্তা লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম খান বলেন, ‘সীমান্ত রক্ষা আমাদের কাজ। কিন্তু এই দেশের সরকারের সদিচ্ছা ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সীমান্তবর্তী এলাকায় অনবরত মাইকিং করছি। সেখানে ভারত থেকে যেকোনো ধরনের তথাকথিত পুশইনের চেষ্টা রুখে দিতে সীমান্তবাসীকে আহ্বান জানানো হচ্ছে। জনগণও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিচ্ছে। যতদিন প্রয়োজন মনে হবে, ততদিন মাইকে প্রচারণা চলবে।’
সাদিপুর গ্রামের আরেক বাসিন্দা শাকিল হোসেন বলেন, ‘আমরা বিজিবির সাথে থেকেই বিএসএফের অপতৎপরতা রুখে দিয়েছি। রাতে টর্চ হাতে বিজিবি সদস্যদের সাথে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করেছি। যতদিন প্রয়োজন হবে, আমরা এভাবে বিজিবির পাশে থাকবো।’
তথাকথিত পুশইনের সময় অবনতিশীল পরিস্থিতিতে দুই দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়। সেখানে বিএসএফের পক্ষ থেকে ঠিক কোন ধরনের যুক্তি তুলে ধরা হয় জানতে চাইলে বিজিবির ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম খান বলেন, ‘তারা আসলে সেখানকার নবনির্বাচিত রাজ্য সরকারের অসৎ ইচ্ছাকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। সে কারণে তাদের কাছে কোনো যুক্তি নেই। তারা পতাকা বৈঠকে অলিক কথাবার্তা বলে। এমনকি মানুষজনকে ঠেলে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টার অভিযোগও অস্বীকার করে।’
সাদিপুর গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা মনে করেন, বিজিবি-জনতার ঐক্য যেকোনো আগ্রাসন মোকাবেলা করতে সক্ষম। এই সীমান্তে গেল কয়েকদিনের ঘটনা তা আবারও প্রমাণ করেছে।