রাব্বি আল-আমিন
, যশোর
দিন দিন যশোরে বাড়ছে গরমের তীব্রতা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের প্রখর তাপে বাড়ছে গরমের তীব্রতা। হাঁসফাঁস করছে মানুষসহ প্রাণীকুল।
প্রায় দুই সপ্তাহের মৃদু তাপপ্রবাহের পর জেলায় এখন শুরু হয়েছে মাঝারি তাপপ্রবাহ। খরতাপে পুড়ছে জেলার প্রাণ-প্রকৃতি, যার ফলে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জনজীবন।
দুপুর গড়াতেই রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন শিশু ও বয়স্করাও।
চলতি সপ্তাহজুড়ে সূর্যের তাপে পুড়ছে যশোর। বৃহস্পতিবার জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অতিরিক্ত গরমে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। রোগীর সংখ্যা বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে। ডায়রিয়া, জ্বর, পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন অনেকে। চিকিৎসকরা পর্যাপ্ত পানি পান, রোদ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, সপ্তাহজুড়ে জেলার তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। গত মঙ্গলবার জেলায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি, বুধবার ৩৮ দশমিক ২ ডিগ্রি এবং বৃহস্পতিবার ৩৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অবশ্য সন্ধ্যায় কিছুটা স্বস্তি নিয়ে ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টি শহরে কিছুটা স্বস্তি আনে।
তীব্র গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। কেউ হাতে-মুখে পানি দিয়ে শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ শরবত, আখের রস কিংবা স্যালাইন পানি পান করে গরমের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করছেন।
আখের রস বিক্রেতা কালাম হোসেন জানান, প্রচণ্ড গরমে মানুষ আখের রস খেতে ভিড় করছে। কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে রস বিক্রি করাই কঠিন হয়ে পড়েছে, ছায়া খুঁজে ব্যবসা করতে হচ্ছে।
রিকশাচালক মুজাহিদ হোসেন বলেন, ‘যেন আগুনের হল্কা লাগছে। একটু রিকশা চালালেই শরীর ঘেমে যাচ্ছে, মাথা ঘোরে। ঠিকমতো রিকশা চালাতে পারছি না। মানুষজন তেমন রাস্তায় বের হচ্ছে না। আমাদের আয় রোজগার কমে যাচ্ছে।’
চর্মকার শচীন দাস বলেন, ‘প্রচণ্ড রোদ পছন্দ গরমের কারণে শহরে মানুষজন তেমন বের হচ্ছে না। আর লোকজন না থাকলে আমাদের তেমন কাজকর্ম হয় না। এদিকে, গরমে ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না।’
যশোর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ঘাঁটিতে অবস্থিত আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, কিছুদিন ধরেই যশোরে এই তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। মাঝেমধ্যে দু-একদিন বৃষ্টি হলেও তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। দু’সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যশোরে তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। এই অস্বস্তিকর আবহাওয়া আরও কয়েকদিন থাকতে পারে।
বাড়ছে রোগীর ভিড়
গরমে সবচেয়ে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু ও বয়স্করা। গরমের কারণে যশোর ও আশেপাশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। ডায়রিয়া, উচ্চ জ্বর, পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন) এবং হিটস্ট্রোকের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চিকিৎসা নিতে আসছেন।
যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, যশোরে গত এক সপ্তাহ যাবত তাপ প্রবাহ চলছে। এতে শিশু ও বয়স্কদের নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুরা বেশি ডায়রিয়াজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাই এই তীব্র গরমের এই সময়ে সুস্থ থাকতে পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি ও তরল খাবার পান করতে হবে। যথাসম্ভব রোদ এড়িয়ে চলতে হবে এবং প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়াই শ্রেয়। বাইরে বের হলে ছাতা ও সুতি ঢিলেঢালা পোশাক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, যশোরে গরমের তীব্রতার ইতিহাস বেশ পুরনো। আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৩০ জুন যশোরে রেকর্ড হয় ৪৩.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিলো ১৯৭২ সালের ১৮ মে রাজশাহীতে, যা ছিল ৪৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।