শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
জ্যৈষ্ঠকে ইদানীং বলা হয় মধুমাস। নানা দেশি ফলের সরবরাহে পরিবেশ মধুময় হয়ে ওঠে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। যশোরের বাজারগুলোতে এখন দেশি ফলের ব্যাপক উপস্থিতি। বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, সফেদা, ডেঁয়ো ও তালের শাঁসের স্তূপ। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে পাকা ফলের মিষ্টি সুবাস।
তবে মধুমাসের এই আনন্দের মধ্যেও দাম নিয়ে রয়েছে ক্রেতাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া। আমের দাম তুলনামূলক কমে সাধারণ মানুষের নাগালে এলেও লিচু, জাম, ডাব, ডেঁয়ো, লটকনসহ অন্যান্য অনেক ফলের দাম এখনও বেশ চড়া বলে অভিযোগ করছেন ক্রেতারা।
কোরবানির ঈদ পার হয়েছে এক সপ্তাহ আগে। কয়েকদিন ধরে মাংস, বিরিয়ানি, কোরমা, রেজালা ও বিভিন্ন মশলাদার খাবার খাওয়ার পর এখন অনেকেই ঝুঁকছেন দেশি ফলের দিকে। চিকিৎসকরাও অতিরিক্ত মাংস ও চর্বিযুক্ত খাবারের পর ফলমূল বেশি খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। ফলে দাম বেশি হলেও পরিবার নিয়ে ফল কিনতে বাজারে ভিড় করছেন মানুষ।
যশোর শহরের মণিহার, চৌরাস্তা, দড়াটানা, রেলগেট, পালবাড়ি, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকার ফলের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় লেগেই আছে। বিশেষ করে বিকেলের পর ফলের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের চাপ বেড়ে যায়। অনেকেই একসঙ্গে কয়েক ধরনের ফল কিনে বাড়ি ফিরছেন।
বর্তমানে যশোরের বাজারে হিমসাগর ও ল্যাংড়া আম প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গোপালভোগ আম ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং আম্রপালি ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। লিচু প্রতি শ ৩৬০ থেকে ৭০০ টাকা, কালোজাম ২০০ থেকে ২৪০ টাকা কেজি, সবেদা ১২০ টাকা, পেয়ারা ১০০ থেকে ১২০ টাকা, পেঁপে ৪০ থেকে ৬০ টাকা এবং কলা প্রতি ডজন ৫০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডাব প্রতিটি ৮০ থেকে ১৫০ টাকা, তরমুজ প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ডেঁয়ো ফল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি এবং লটকন ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁঠাল আকারভেদে ১০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া তালের শাঁস প্রতিটি ৫ থেকে ১০ টাকায় পিস বিক্রি হতে দেখা গেছে।
দড়াটানা মোড়ের ফল বিক্রেতা কল্লোল হোসেন বলেন, এখন বাজারে দেশি ফলের সরবরাহ অনেক বেশি। হিমসাগর আম ৬০ টাকা, জাম ২০০ টাকা, ডেঁয়ো ১৬০ টাকা, লটকন ২০০ টাকা এবং বোম্বাই লিচু ৫০০ টাকা শ বিক্রি হচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় অনেক ফলের দাম কমেছে।
হাসপাতাল মোড়ের ফল ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন বলেন, এখন দেশি ফলের ভরা মৌসুম। প্রতিদিন প্রচুর আম, লিচু ও কাঁঠাল আসছে। সরবরাহ বাড়ার কারণে আমের দাম অনেকটা কমেছে। তবে কিছু ফলের উৎপাদন কম থাকায় সেগুলোর দাম এখনও বেশি।
চৌরাস্তা মোড়ে ফল বিক্রেতা কাওছার আলী বলেন, রাজশাহী ও দিনাজপুর থেকে প্রতিদিন লিচু আসছে। হিমসাগর ও ল্যাংড়া আম ৬০ টাকা কেজি, বোম্বাই জাম ২০০ টাকা কেজি এবং লিচু ৩৬০ থেকে ৪০০ টাকা শত বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতার চাপও অনেক বেশি।
মণিহার হলের পাশের ফল ব্যবসায়ী রোস্তম আলী বলেন, ঈদের পর ফলের বিক্রি বেড়েছে। মানুষ এখন গরমে তরল খাবারের পাশাপাশি ফল কিনছে বেশি। প্রতিদিন আগের তুলনায় বিক্রি প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
মণিহার পাইকারি ফল মোকামের ব্যবসায়ী ও মেসার্স সিয়াম খন্দকার ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মিঠু খন্দকার জানান, বর্তমানে যশোরে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ট্রাক আম প্রবেশ করছে। প্রতিটি ট্রাকে গড়ে ১০ থেকে ১২ টন আম থাকে। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ১২০ টন আম বাজারে আসছে।
বর্তমানে যশোরে প্রতিদিন গড়ে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার কেজি (গড়ে ৯৯ হাজার কেজি) আম আসছে। পাইকারি বাজারে ৫০ টাকা কেজি দরে এই আমের মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। পরবর্তীতে খুচরা বাজারে যখন এই আম প্রতি কেজি ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়, তখন সব মিলিয়ে দৈনিক মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা (সর্বনিম্ন ৪৮ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৭২ লাখ টাকা পর্যন্ত)।
এছাড়া প্রতিদিন হাজার হাজার কাঁঠাল, কয়েক লাখ লিচু এবং বিপুল পরিমাণ জাম, পেয়ারা, তরমুজ ও অন্যান্য ফল আসছে।
তিনি বলেন, আমের উৎপাদন ভালো হওয়ায় এবার দাম তুলনামূলক কম। কিন্তু পরিবহন খরচ, শ্রমিক মজুরি, বাজার খাজনা এবং ফল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকির কারণে অন্যান্য ফলের দাম কিছুটা বেশি রয়েছে।
বাজারে ফলের সমারোহ থাকলেও দাম নিয়ে অসন্তুষ্ট অনেক ক্রেতা। শংকরপুর এলাকার বাসিন্দা সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমের দাম কমেছে এটা ভালো খবর। কিন্তু একশ লিচু, এক কেজি জাম, দুটি ডাব, কিছু কলা আর কয়েক কেজি আম কিনতেই এক হাজার ২০০ টাকা থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়ে যায়। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটা অনেক টাকা।
মুজিব সড়ক এলাকার সেলিনা শুভ্রা বলেন, যেহেতু এখন মধুমাস, গরমে তরল খাবারের পাশাপাশি শিশুর জন্য ফল কিনতে হচ্ছে। কিন্তু লিচু, জাম ও ডাবের দাম এখনও অনেক বেশি। বাজারে এত ফল থাকার পরও সব ফল সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নেই।
চৌরাস্তা বাজারে ফল কিনতে আসা জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমের বাজারে স্বস্তি এসেছে। কিন্তু অন্য ফলের দাম কমেনি। আগে ৫০০ টাকায় যে পরিমাণ ফল পাওয়া যেত, এখন একই পরিমাণ কিনতে প্রায় দ্বিগুণ টাকা লাগছে।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, যশোর শহরের বড় ও ছোট বাজার মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার ফল বেচাকেনা হচ্ছে। শুধু মণিহার, চৌরাস্তা, দড়াটানা ও পালবাড়ি এলাকার বাজারগুলোতেই দৈনিক ৩০ লাখ টাকার বেশি ফল বিক্রি হচ্ছে। কোরবানির ঈদের পর ফলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বেচাকেনাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যশোরের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান বলেন, মৌসুমি ফলের বাজার নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। কোনো ব্যবসায়ী যাতে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াতে না পারেন, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। কেউ অতিরিক্ত দাম আদায়ের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।