বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ
রায়হান সিদ্দিক
, যশোর
প্রতিদিন গড়ে ৮০ টন বর্জ্য জমা হয় যশোর পৌর এলাকায়, যার সিংহভাগই আসে গৃহস্থালি বা বাসাবাড়ি থেকে। তবে বিপুল পরিমাণ এই বর্জ্য অপসারণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঠিক কোনো আধুনিক রূপরেখা না থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে এসব আবর্জনা পড়ে থাকছে শহরের অলি-গলিতে ও প্রধান সড়কের ধারে। কোথাও ডাস্টবিন উপচে পচা ময়লা ছড়িয়ে পড়ছে রাস্তায়, আবার কোথাও সড়কই পরিণত হয়েছে স্থায়ী ডাস্টবিনে। ফলে বাতাসে ভাসছে উৎকট গন্ধ, দূষিত হচ্ছে চারপাশের বায়ুমণ্ডল। এতে একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও শহরের নান্দনিকতা, অন্যদিকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন সাড়ে চার লাখ পৌরবাসী।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সুবর্ণভূমির পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। সরিজমিনে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হয়েছে পরিবেশবিদদের সাথেও। নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন পৌরবাসীও।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’ হলেও, যশোরের বাস্তব চিত্র যেন একেবারে বিপরীত। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, প্রথম শ্রেণীর এই পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এমন নাজুক হালের জন্য আসলে দায়ী কে?
রেলরোড সিঅ্যান্ডবি মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, সকাল দশটা পার হয়ে গেলেও সড়কের ধারে জমে আছে ময়লার স্তূপ। এটি কোনো ব্যতিক্রমী চিত্র নয়, বরং পৌরবাসীর প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য। স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ডাস্টবিনগুলো সময়মতো পরিষ্কার না করায় এবং অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে যত্রতত্র ময়লা ফেলছে।
হাসিবুর রহমান নামে একজন পথচারী বলেন, ‘এই ডাস্টবিনটার অবস্থা খুবই খারাপ। পাশেই একটা মসজিদ আছে, আমরা যখন নামাজ পড়ে বের হই, তখন নাকে তীব্র দুর্গন্ধ লাগে। শিশুরা এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করে। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই ডাস্টবিনের ময়লা পরিষ্কার করার নিয়ম থাকলেও ময়লার স্তূপ থাকে অনেক বেলা এমনকী কয়েকদিন পর্যন্ত। এতে রোগজীবাণু ছড়াচ্ছে, পরিবেশ পুরো অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়েছে।’
একই এলাকার আরেক পথচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখন এই রাস্তা দিয়ে চলাই যায় না, এত দুর্গন্ধ। সকাল ৯টা-১০টা বেজে গেলেও ময়লা সরানো হয় না। আমাদের এই রাস্তায় চলাচল করতে তীব্র ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। একইরকম অবস্থা পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের।’
নাগরিকদের মতে, পৌরসভা কর্তৃক শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো থেকে পুরোনো ডাস্টবিনগুলো সরিয়ে নেওয়ার পর থেকেই সংকটের তীব্রতা বেড়েছে। মোস্তফা মোল্লা বলেন, পৌরসভার পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকার কারণে যে যার মতো রাস্তার পাশে ময়লা ফেলে যাচ্ছে। আগে পয়েন্টে পয়েন্টে ডাস্টবিন ছিল, সেগুলো সরানো হয়েছে। পৌরসভা যদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে প্রত্যেকটা মোড়ে ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করতো, তবে এই দুর্ভোগ হতো না।
সচেতন মহল মনে করছে, ডাস্টবিন না থাকায় বিচ্ছিন্নভাবে ফেলে রাখা ময়লাগুলো বেওয়ারিশ কুকুর ও গবাদিপশু টেনেহিঁচড়ে রাস্তার মাঝখানে ও মানুষের বাসাবাড়ির সামনে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই অব্যবস্থাপনা দূর করতে প্রশাসন, সরকার ও সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে একটি ‘আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখার নেপথ্য কারিগর যারা, সেই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার। জীবন রক্ষাকারী ন্যূনতম সেফটি ইকুইপমেন্ট ছাড়াই বংশানুক্রমে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছেন তারা। বেজপাড়া মেইন রোড ও গোলগুল্লার মোড়ে কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের মানবেতর কর্মপরিবেশের কথা।
এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের এই কাজের জন্য গামবুট, হ্যান্ডগ্লাভস ও মাস্ক দরকার। কিন্তু পৌরসভা আমাদের এসব কিছুই দেয় না। নিরুপায় হয়ে খালি হাতেই ময়লা ঘাঁটতে হয়। কাজটা বাধ্যতামূলক, কারণ চাকরি তো আমাদের এটিই।’
১৭-১৮ বছর ধরে কাজ করা আরেক কর্মী করোনাকালীন ভয়ংকর পরিস্থিতির কথা স্মরণ করে বলেন, ‘আমাদের চার পুরুষ এই কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সিকিউরিটি বা সুযোগ-সুবিধা পাইনি। ঝড়, বৃষ্টি, তীব্র শীত বা এই গরমেও আমাদের আনলিমিটেড কাজ করতে হয়। অন্য সব শহরে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলেও যশোর পৌরসভা আমাদের কোনো খোঁজ নেয় না। কাজ শেষে শরীরের ক্লান্তি আর শেষ হয় না।’
সাড়ে চার লাখ মানুষের জন্য গৃহস্থালী ডাস্টবিন মাত্র দশ হাজার!
তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে যশোর পৌরসভার লজিস্টিক সাপোর্টের এক বিশাল ঘাটতি সামনে আসে। ১৪.৭২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই প্রথম শ্রেণীর পৌরসভায় বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের বসবাস। গড় পরিবার প্রতি সদস্য ৪.৫ জন হিসাব করলে শহরে পরিবারের সংখ্যা প্রায় এক লাখ।
অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বর্জ্য সংগ্রহের জন্য পুরো পৌর এলাকায় বড় কন্টেইনার রয়েছে মাত্র ৪০টি এবং মাঝারি কন্টেনার ৫০০টি। আর এক লাখ পরিবারের বিপরীতে গৃহস্থালি বা হাউসহোল্ড ডাস্টবিন দেওয়া হয়েছে মাত্র ১০ হাজারটি। অর্থাৎ, এখনো প্রায় ৯০ হাজার পরিবার পৌরসভার সরাসরি বর্জ্য সংগ্রহ কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে। ২৫ হাজার অফিশিয়াল হোল্ডিংয়ের বিপরীতে এই লজিস্টিক সাপোর্ট যে অত্যন্ত অপ্রতুল, তা সহজেই অনুমেয়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই নাজুক দশা ও অনিয়মের অভিযোগের জবাবে যশোর পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ মোরাদ আলী বলেন, ‘জনসংখ্যার অনুপাতে লজিস্টিকের এই গ্যাপটি আসলে একটি জাতীয় সংকট। আমাদের সীমিত রাজস্ব আয় দিয়ে এই কাজগুলো করতে হয়। ২৫ হাজার হোল্ডিংয়ের মধ্যে আমরা ১০ হাজার ডাস্টবিন বাসাবাড়িতে দিতে পেরেছি, বাকি ১৫ হাজার হোল্ডিংয়ের মানুষ রাস্তার কন্টেইনার ব্যবহার করেন। এই সংখ্যাটি অবশ্যই পর্যাপ্ত নয়।’
নির্ধারিত সময়ে ময়লা না নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা দিনে একাধিকবার ডাস্টবিন পরিষ্কার করি। কিন্তু দেখা যায় সকাল ৮টায় আমরা ময়লা নিয়ে যাওয়ার পর, মানুষ আবার ৮টা থেকে ১২টার স্লটে এসে ময়লা ফেলছেন। নির্ধারিত সময়ের পর ময়লা না ফেলার জন্য আমরা মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করছি। এতে আমাদের সময় ও সম্পদের অপচয় হচ্ছে।’
যশোরের হামিদপুরে অবস্থিত একমাত্র ‘ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান্ট’ (বর্জ্য শোধনাগার) নিয়েও হতাশার কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পরীক্ষামূলক ১৫টি পৌরসভার মধ্যে কেবল যশোরেই এই প্ল্যান্টটি কোনোমতে ফাংশনাল আছে। তবে এটি আপ-টু-দ্য-মার্ক নয়। প্রতিদিন গড়ে ৮০ টন ময়লা ডাম্প করা হলেও প্ল্যান্টটির নকশা করা হয়েছিল মাত্র ৪০ টন প্রসেস করার জন্য। অথচ বাস্তবে সেখানে দিনে মাত্র ১০ টনের মতো ময়লা প্রসেস করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি ৭০ টন বর্জ্য অপরিশোধিত থেকে যাচ্ছে।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সেফটি ইকুইপমেন্ট প্রসঙ্গে সিইও দাবি করেন, সরঞ্জাম দেওয়া হলেও কর্মীরা তা ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, তবে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বর্জ্য সমস্যা সমাধানে তিনি ‘ডোর-টু-ডোর’ (বাড়ি বাড়ি থেকে ভ্যানের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহ) মডেল চালুর কথা বলেন, যা ইতিমধ্যে শহরের সাতটি ওয়ার্ডে চালু হয়েছে এবং বাকি দুটি ওয়ার্ডেও দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
পরিবেশে ওপর বিরূপ প্রভাব
এদিকে, যত্রতত্র বর্জ্য ফেলে রাখার কারণে যশোরের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান মোল্লা বলেন, ময়লার স্তূপের বাইরে বাতাসের সংস্পর্শ থাকলেও, ভেতরের অংশে ‘অ্যানায়রোবিক কন্ডিশন’ (বায়ুর অনুপস্থিতি) তৈরি হয়। এর ফলে সেখানে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা বাতাসে তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়ায় এবং শিশুদের ফুসফুসের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, বর্জ্য পচনের ফলে হাইড্রোজেন সালফাইডের সাথে অনেক টক্সিক কেমিক্যাল তৈরি হয়, যা ‘লিচেট’ (বর্জ্য নিঃসৃত তরল) আকারে ড্রেনেজ সিস্টেমে চলে যায়। ড্রেনগুলো ব্লক হয়ে নোংরা পানি রাস্তায় চলে আসে, যা সরাসরি পরিবেশ ও মানবদেহের সংস্পর্শে আসছে। মাটিতে মিশে যাওয়া এই টক্সিক উপাদানগুলো আলটিমেটলি আমাদের ফুড চেইন বা খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। এছাড়া মশা-মাছির মাধ্যমে ডায়রিয়া ও ফুড পয়েন্টনিংয়ের জীবাণু ছড়াচ্ছে, যার প্রতি শিশুরা সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল।
বাড়তি শঙ্কা ক্লিনিক্যাল বর্জ্যে
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, সাধারণ গৃহস্থালি বর্জ্যের সাথেই শহরের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিপজ্জনক চিকিৎসাবর্জ্য একই স্থানে ডাম্পিং করা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক প্রকার টাইমবোমা।
উত্তরণের উপায়
যবিপ্রবির পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. সাইদুর রহমান মোল্লা মনে করেন, এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো সরকারি কঠোর নিয়ম এবং জাপানের মতো ‘বর্জ্য পৃথকীকরণ’ ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়ন। জাপান বা উন্নত বিশ্বে উৎসমুখেই অর্থাৎ বাসাবাড়ি, অফিস বা ইন্ডাস্ট্রি থেকেই পচনশীল, অপচনশীল, প্লাস্টিক, কাচ ও কাগজ আলাদা আলাদা বিনে সংগ্রহ করা হয়। লোহা, প্লাস্টিক ও পলিথিন রিসাইকেল করা এবং কাগজ পুড়িয়ে ফেলার সুনির্দিষ্ট সিস্টেম থাকলে টোকাই থেকে শুরু করে সরকার-সবাই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে এবং শহরও পরিচ্ছন্ন থাকবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর যশোরের সহকারী পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘যত্রতত্র ময়লা পড়ে থাকায় মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ও সংক্রামক রোগ ছড়াচ্ছে। সরাসরি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পৌরসভার কাজ হলেও, এই সংকট উত্তরণে আমরা জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে পৌরসভার সাথে কোলাবোরেশনের মাধ্যমে ব্যবস্থা আরও উন্নত করার উদ্যোগ নেব।’
সর্বোপরি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেবল কোনো একটি সংস্থার একক দায়িত্ব নয়, এটি একটি সমন্বিত সামাজিক কালচার। যতদিন না পৌরবাসী নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে সলিড ও পচনশীল বর্জ্য আলাদা করে ফেলার অভ্যাস গড়বেন, ততদিন পর্যন্ত কোটি টাকার অবকাঠামো করেও যশোর শহরকে নিরাপদ ও দূষণমুক্ত করা সম্ভব নয়।