যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

এইচএসসিতে যশোর বোর্ডে শূন্য পাস কলেজ

নেই শিক্ষক, হয় না ক্লাস, পাস করবে কীভাবে

গোলাম মোস্তফা

, যশোর

প্রকাশ : শনিবার, ৭ নভেম্বর,২০২৬, ১০:১০ এ এম
নেই শিক্ষক, হয় না ক্লাস, পাস করবে কীভাবে

যশোরের সবুজ পল্লী কলেজ। মণিরামপুর-খেদাপাড়া রোডের পাশে ধানখেতের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট দুটি কাঁচাপাকা ভবন। একটি কাঁচা-পাকা ঘর থেকে খসে পড়েছে পলেস্তরা। অন্যটি কিছুটা নতুন। শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন পাননি কখনও। আর ইংরেজির প্রভাষক এস আলম মারা গেছেন ২০২৫ সালে। এমপিওভুক্ত না হওয়ায় আসছেন না কোনো শিক্ষক।

শিক্ষক নেই, লেখাপড়া নেই। শিক্ষার্থীরা পাস করবেন কীভাবে?—এমন প্রশ্ন খেদাপাড়া এলাকার মানুষের।

মণিরামপুর উপজেলার খেদাপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিএম ওমর ফারুকের উদ্যোগে ২০০৩ সালে সবুজ পল্লী কলেজটি স্থাপিত হয়। কলেজে মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগে পাঠদানের অনুমোদন মেলে। তখন শিক্ষক ছিলেন ১৫ জন। পরবর্তীতে বেতনভাতা না পাওয়ায় বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষকরা চলে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরাও মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তখন মানবিক বিভাগের পাঁচজন প্রভাষক ক্লাস নিতেন। এরপর ২০২৫ সালের ৪ মার্চ ইংরেজির একমাত্র প্রভাষক এস আলমের মৃত্যু হয়।

নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানটিতে সরকারি কোনো বেতন-ভাতার নিশ্চয়তা না থাকায় ওই পদে কেউ চাকরির জন্য আগ্রহ দেখাননি বা আবেদনও করেননি। যে কারণে ইংরেজি শিক্ষক ছাড়াই ছাত্রছাত্রীরা পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

২০২২ সালে এই কলেজ থেকে ৩৬ জন পরীক্ষা দিয়ে ২৯ জন পাস করেন। ২০২৩ সালে ২৭ জন পরীক্ষা দিয়ে ২৬ জন, ২০২৪ সালে দশ জন পরীক্ষা দিয়ে আটজন, ২০২৫ সালে পাঁচজন পরীক্ষা দিয়ে তিনজন পাস করেন। কিন্তু এবার সাতজন পরীক্ষা দিলেও পাস করেননি কেউই। পরীক্ষার্থীদের মধ্যে এক বিষয়ে ফেল করেছেন তিনজন। দুই বিষয়ে ফেল করেছেন দুইজন।

কলেজ মোড়ের দোকানি আবু রহিম বলেন, ‘এলাকার অধিকাংশ ছেলেমেয়ে কলেজটিতে পড়তো। কয়েক বছর পর শিক্ষকরা চলে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরাও আসা বন্ধ করে দেয়।’

খেদাপাড়া বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, ২০০৬ সালের পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এসএম আব্দুল হক ‘সবুজ পল্লী কলেজের’ কাছেই ‘মাতৃভাষা কলেজ’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। আওয়ামী শাসনামলে তিনি ওই কলেজটি দ্রুত এমপিওভুক্ত করাতে সক্ষম হন। আর আগে স্থাপিত সবুজ পল্লী কলেজটি বঞ্চিত হয়। এর মধ্যে ইংরেজির শিক্ষক মারা গেছেন। অর্থনীতির শিক্ষক রমজান আলী ইংরেজি ক্লাস নিতেন। শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে।

কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘২৩ বছর ধরে কলেজে শিক্ষকতা করছি। এক পয়সাও পাইনি। ছেলেমেয়ে, ঘর সংসার তো রয়েছে।’

বর্তমানে একাদশ শ্রেণিতে ৩১ জন এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে ৪১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের মুখের তাকিয়ে এখনও আছি।’

এমপিওভুক্ত না হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, যে যে শর্ত পূরণ করতে হয় এ কলেজে তা সবসময় ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে এ কলেজটি এমপিওভুক্ত হতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, কলেজের প্রতিষ্ঠাতা খেদাপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিএম ওমর ফারুক ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। মণিরামপুরের তৎকালীন এমপি খান টিপু সুলতান এমপিওতে কোনো বাধা না দিলেও স্বপন ভট্টাচার্য এমপি ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে নানাভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। কলেজটির একমাত্র কাঁচাপাকা ভবনের পলেস্তারা খসে পড়তে থাকে। এরপর ২০২৫ সালে সংসদ সদস্য ইয়াকুব আলী কলেজে একটি ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করে দেন।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের এক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বলেন, ‘চেয়ারম্যানের সাথে থেকে অনেক আশা নিয়ে আমরা কলেজেটি করেছিলাম। কিন্তু কয়েক বছর পার হলেও এমপিও না হওয়ায় ও বিজ্ঞান এবং বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষকরা চলে যান। শিক্ষার্থীদের কলকাকলীমুখর কলেজটি এখন কোনোরকমে টিকে আছে। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে পাসের হার বাড়বে।’

খেদাপাড়ার স্কুলশিক্ষক মতিয়ার রহমান বলেন, ‘ভূগোল শিক্ষক দিয়ে ইংরেজি পড়ালে শিক্ষার্থীরা কেউ পাস করবে না—এটাই স্বাভাবিক। তবে, পুরনো প্রতিষ্ঠান। এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষক পাওয়া যাবে। তখন এ সমস্যা থাকবে না।’

খেদাপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম জিন্না বলেন, ‘কলেজটি খুব দুরবস্থার মধ্যে আছে। এ বছর কেউ পরীক্ষা দিয়েছিল কি না জানি না। তবে এমপিওভুক্ত হলে এ প্রতিষ্ঠান প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে। এলাকার স্বার্থে, আমাদের ছেলে-মেয়েদের স্বার্থে কলেজটি এমপিওভুক্তির দাবি করছি।’

সবুজ পল্লী কলেজের প্রধানকে ডেকে স্বীকৃতি নবায়ন করা হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে যশোর শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম হোসেন আলী বলেন, শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিক্ষাবোর্ড অত্যন্ত কঠিন অবস্থানে আছে। কোনো প্রকার ছাড় হবে না।

যশোর শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ফারুকে আযম মু. আব্দুস ছালাম ও সচিব প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মতিনের সতর্কতার সূত্র ধরে তিনি আরও বলেন, বোর্ড থেকে বারবার সতর্ক করা হয়েছে। তবে, এবছর স্বীকৃতির নবায়ন হবে না—এমন নির্দেশনার কথা তিনি অস্বীকার করেন।

কলেজের অধ্যক্ষ রেজাউল ইসলাম বলেন, অন্যান্য বারে পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হলেও এবার কেউ পাস করেনি। ইংরেজি প্রভাষক না থাকার কারণে এ বিপর্যয় ঘটেছে।

তিনি বলেন, ‘একজন খণ্ডকালীন ইংরেজি শিক্ষক দিয়ে ক্লাস করানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাকে বেতন না দেওয়ায় তিনি মাস দুয়েক পর আর আসেননি। স্কুল হলে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ইংরেজি পড়ানো যেত। কিন্তু কলেজে সেটি সম্ভব হচ্ছে না।’

কলেজের পরিচালনা পর্যদের সভাপতি কবীর হোসেন বলেন, এলাকার শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এর উপর নানা ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে। তারপরও টিকে আছে। প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম পাসের হার শূন্য। ইংরেজি শিক্ষক থাকলে এ অবস্থা হতো না। আগামীতে যাতে এ অবস্থা না হয়, তার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)