সুবর্ণভূমি ডেস্ক
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলের জন্য একটি বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে বিএনপি। একই সঙ্গে চলতি বছরের শেষদিকে দলের জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পক্ষেও মত দিয়েছেন স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্য। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জাতীয় কাউন্সিল, সাংগঠনিক কার্যক্রম, অর্থনীতি, নেতাকর্মীদের স্বাবলম্বী করা এবং সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এ বিষয়গুলো কেন্দ্র করে গতকাল শনিবার রাতে অনুষ্ঠিত বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
দলীয় সূত্র জানায়, রাত ৮টার দিকে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বৈঠক শুরু হয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা চলে। রাত ১০টার দিকে বৈঠক শেষ হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকের শুরুতে মালয়েশিয়া ও চীন সফর সফলভাবে সম্পন্ন করায় তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। এ সময় তাঁর হাতে একটি ক্রেস্টও তুলে দেওয়া হয়।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক সূত্রের ভাষ্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কয়েকজন সদস্য চলতি বছরের শেষদিকে নির্বাচন শুরুর পক্ষে মত দেন। যদিও নির্দিষ্ট কোনো সময় নির্ধারণ করা হয়নি। আলোচনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. জাহিদ হোসেনের 'সেপ্টেম্বরে নির্বাচন শুরুর সম্ভাবনা' নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যও উঠে আসে। তবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
অধিকাংশ সদস্যের অভিমত ছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলটির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এখন থেকেই তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার, স্থানীয় পর্যায়ে দলের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং নির্বাচনের উপযোগী সংগঠন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। কয়েকজন সদস্য এ প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে তারেক রহমান বলেন, "দলের কাউন্সিল অবশ্যই হবে।"
সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্য চলতি বছরের শেষ দিকে কাউন্সিল আয়োজনের পক্ষে মত দেন। একই সঙ্গে যেসব জেলা, মহানগর ও অন্যান্য সাংগঠনিক ইউনিটের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলো দ্রুত পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচির কথা বিবেচনায় রেখে তৃণমূলে নতুন নেতৃত্ব তৈরি ও সাংগঠনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করার ওপরও জোর দেন নেতারা।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং কর্মসংস্থানের বিষয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সূত্র জানায়, বেকারত্ব কমানো, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। এছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং খাল পুনঃখনন কর্মসূচির বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি যেসব প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি, সেগুলোর বাস্তবায়ন কৌশল নিয়েও মতবিনিময় করেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।
বৈঠকে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা নেতাকর্মীদের আর্থিক অবস্থার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। দুজন সদস্য বলেন, গত ১৭ বছরে অনেক নেতাকর্মী চাকরি, ব্যবসা কিংবা জীবিকার সুযোগ হারিয়েছেন। তাদের পুনর্বাসন এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়। এ সময় যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধার ভিত্তিতে মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সদস্যদের মতে, আওয়ামী লীগের মতো শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে বিএনপি চাকরি দেবে না। কারণ এমন নীতি অনুসরণ করলে অতীতের মতো অনেকের চাকরি হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বর্তমান বন্যা পরিস্থিতিও বৈঠকের আলোচনায় স্থান পায়। বন্যাকবলিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দলের ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে দুর্গত এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয়ভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, সরকার গঠনের পর নানা ব্যস্ততার কারণে দীর্ঘদিন পর এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের কার্যক্রম এবং দলের সাংগঠনিক বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেগম সেলিমা রহমান এবং ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উপস্থিত ছিলেন।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটি বিএনপির স্থায়ী কমিটির তৃতীয় বৈঠক। এর আগে গত ৪ এপ্রিল ও ১৭ মে দলটির স্থায়ী কমিটির দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।